প্রিন্ট এর তারিখ : ১০ মে ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ১০ মে ২০২৬
ফেরেশতার গল্প, ফেসবুক রাজনীতি এবং প্রশাসনিক ষড়যন্ত্রের অন্ধকার বাস্তবতাা
"মনিরুজ্জামান মনির" ||
রাষ্ট্র পরিচালনার গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভগুলোর মধ্যে প্রশাসন অন্যতম। আর প্রশাসনের শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের বক্তব্য সাধারণ মানুষের কাছে শুধু ব্যক্তিগত মতামত নয়, বরং রাষ্ট্রীয় মানসিকতা ও নৈতিকতার প্রতিফলন হিসেবেও বিবেচিত হয়। সেই কারণেই একজন সাবেক সিনিয়র সচিব যখন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ে নাটকীয়, আবেগতাড়িত ও রহস্যঘেরা পোস্ট দেন, তখন সেটি নিছক ফেসবুক স্ট্যাটাস থাকে না—বরং তা জনমনে বিভ্রান্তি, প্রশ্ন এবং সন্দেহের জন্ম দেয়।সম্প্রতি রেলপথ মন্ত্রণালয়ের একজন সাবেক সিনিয়র সচিব তার ভেরিফাইড ফেসবুক পেজে একটি পোস্ট করেন। সেখানে তিনি লিখেছেন—“তিনি জাতির কাছে ফেরেশতা হিসেবে খ্যাত।”এই একটি বাক্য দিয়েই পুরো লেখাটির উদ্দেশ্য, মনস্তত্ত্ব এবং কৌশল অনেকটাই স্পষ্ট হয়ে যায়। কারণ রাষ্ট্র পরিচালনায় কেউ “ফেরেশতা” নন। রাষ্ট্রে দায়িত্ব পালন করেন মানুষ—যাদের সিদ্ধান্ত ভালোও হতে পারে, ভুলও হতে পারে। সেখানে একজন সাবেক আমলার মুখে “ফেরেশতা” শব্দের ব্যবহার নিছক প্রশংসা নয়; বরং এটি পাঠকের আবেগ নিয়ন্ত্রণের একটি সূক্ষ্ম কৌশল বলেই প্রতীয়মান হয়।এরপর তিনি একটি ডিজি নিয়োগ বোর্ডের কাহিনী বর্ণনা করেন। দাবি করেন, এক উচ্চপর্যায়ের ব্যক্তি সাক্ষাৎকার বোর্ডে একজন কর্মকর্তাকে “দুর্নীতিবাজ চোর কর্মকর্তা” বলে অপমান করেন, এমনকি “আমি হলে সুইসাইড করতাম” বলেও মন্তব্য করেন। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো—পরদিন সেই কর্মকর্তাকেই ডিজি হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়।প্রশ্ন হলো—তিনি কি সেই বোর্ডে উপস্থিত ছিলেন? প্রশাসনিক সূত্র বলছে, তিনি ওই ইন্টারভিউ বোর্ডের সদস্য ছিলেন না এবং সাক্ষাৎকার চলাকালীনও সেখানে উপস্থিত ছিলেন না। তাহলে তিনি কীভাবে শব্দে শব্দে পুরো সংলাপ জানলেন? কে তাকে এই তথ্য দিল? আর সেই তথ্যে কতটুকু সত্যতা রয়েছে?রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ নিয়োগ বোর্ডের আলোচনা সাধারণত গোপনীয়। সেখানে কে কী বলেছে, কে কাকে অপমান করেছে—এসব তথ্য প্রকাশ করা প্রশাসনিক আচরণবিধির সঙ্গেও সাংঘর্ষিক। ফলে এখানে দুটি সম্ভাবনা সামনে আসে—(১) হয় তথ্যটি গোপন বৈঠক থেকে বেআইনিভাবে ফাঁস হয়েছে, (২) নয়তো ঘটনাটি নাটকীয়ভাবে সাজিয়ে উপস্থাপন করা হয়েছে।আর যদি দ্বিতীয়টি সত্য হয়, তাহলে প্রশ্ন আরও গুরুতর।কারণ একজন সাবেক সচিবের প্রতিটি বক্তব্য জনমনে প্রভাব ফেলে। তার কথাকে মানুষ বিশ্বাসযোগ্য হিসেবেই ধরে নেয়। সেই জায়গা থেকে কোনো প্রমাণ ছাড়া একজন কর্মকর্তাকে “দুর্নীতিবাজ” হিসেবে উপস্থাপন করা, কিংবা একটি রাষ্ট্রীয় নিয়োগ প্রক্রিয়াকে নাটকীয় গল্পে রূপ দেওয়া—এটি নিছক মতপ্রকাশ নয়; বরং এটি হতে পারে জনমত প্রভাবিত করার অপচেষ্টা।সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় ওই সাবেক সচিব ওএসডি হয়েছিলেন। ফলে প্রশাসনিক অঙ্গনের একটি অংশ এখন প্রশ্ন তুলছে— এই পোস্ট কি শুধুই অভিজ্ঞতা বর্ণনা, নাকি এর পেছনে রয়েছে ব্যক্তিগত ক্ষোভ, পদায়ন রাজনীতি কিংবা নিজের পছন্দের কাউকে ডিজি পদে বসাতে না পারার হতাশা?কারণ পোস্টটির ভাষা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সেখানে প্রশাসনিক নিরপেক্ষতার চেয়ে আবেগ, নাটকীয়তা এবং ইঙ্গিতপূর্ণ আক্রমণই বেশি।“দুর্নীতিবাজ চোর কর্মকর্তা”, “লজ্জাশরম নেই”, “অভিশপ্ত জাতি”— এসব শব্দ কোনো দায়িত্বশীল প্রশাসনিক বিশ্লেষণের ভাষা হতে পারে না।বরং এটি এমন এক বর্ণনাশৈলী, যা জনমনে ক্ষোভ তৈরি করে, সামাজিক বিভাজন বাড়ায় এবং একটি নির্দিষ্ট কর্মকর্তাকে বিতর্কিত করার চেষ্টা করে।আরও ভয়ংকর বিষয় হলো, “ফেরেশতা” শব্দ ব্যবহারের মাধ্যমে প্রথমেই একজন ব্যক্তিকে নৈতিকতার সর্বোচ্চ আসনে বসানো হয়েছে। এরপর তার মুখ দিয়ে কঠোরতম ভাষা বলিয়ে পুরো গল্পটিকে এমনভাবে দাঁড় করানো হয়েছে, যেন পাঠক মনে করে— “যিনি এত সৎ যে জাতি তাকে ফেরেশতা ভাবে, তিনি যদি কাউকে চোর বলেন, তাহলে নিশ্চয়ই সে চোর।”এটি জনমত নিয়ন্ত্রণের অত্যন্ত সূক্ষ্ম মনস্তাত্ত্বিক কৌশল।প্রশ্ন হচ্ছে— রাষ্ট্রের একজন সাবেক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা কি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এভাবে বিচারকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে পারেন?যদি কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির সুনির্দিষ্ট তথ্য থাকে, তাহলে সেটি দুর্নীতি দমন কমিশন, আদালত কিংবা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে উপস্থাপন করা উচিত। কিন্তু রহস্যময় গল্প লিখে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিচার বসানো রাষ্ট্রীয় দায়িত্বশীলতার মধ্যে পড়ে না।আজ প্রশাসনের ভেতরে মতবিরোধ, লবিং কিংবা পদায়ন রাজনীতি নতুন কিছু নয়। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমকে ব্যবহার করে ইঙ্গিতপূর্ণ পোস্ট, নাটকীয় গল্প এবং আবেগঘন অভিযোগের মাধ্যমে প্রশাসনিক চাপ সৃষ্টি করার প্রবণতা উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে।এতে ব্যক্তি নয়, ক্ষতিগ্রস্ত হয় পুরো রাষ্ট্রীয় কাঠামো। জনগণের মনে জন্ম নেয় অবিশ্বাস। প্রশাসনের প্রতি আস্থা দুর্বল হয়। আর সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি।রাষ্ট্র পরিচালনায় সমালোচনা অবশ্যই প্রয়োজন। কিন্তু সেই সমালোচনা হতে হবে তথ্যভিত্তিক, দায়িত্বশীল এবং প্রমাণনির্ভর। ব্যক্তিগত ক্ষোভ, প্রশাসনিক দ্বন্দ্ব কিংবা পদায়ন রাজনীতির হাতিয়ার হিসেবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমকে ব্যবহার করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।কারণ একটি রাষ্ট্র তখনই শক্তিশালী হয়, যখন তার প্রতিষ্ঠানগুলো সত্য ও প্রমাণের ভিত্তিতে পরিচালিত হয়—রহস্যঘেরা গল্প, আবেগতাড়িত নাটকীয়তা এবং ফেসবুক রাজনীতির মাধ্যমে নয়।লেখকঃ সাংবাদিক ও কলামিস্ট
সম্পাদক ও প্রকাশকঃ মো: মনিরুজ্জামান (মনির)
কপিরাইট © ২০২৬ দৈনিক রেলওয়ে বার্তা । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত