প্রিন্ট এর তারিখ : ১১ অক্টোবর ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ১১ অক্টোবর ২০২৬
জেড-আর মানিক , নিজস্ব প্রতিবেদক ||
মিয়ানমারের সামরিক জান্তার নির্যাতন থেকে বাঁচতে কক্সবাজারের উখিয়া-টেকনাফ ও ভাসানচরের ঘিঞ্জি শিবিরে আশ্রয় নেওয়া ১২ লক্ষাধিক রোহিঙ্গার মধ্যে অর্ধেকেরও বেশি শিশু। খোলা আকাশে মাথার ওপর ত্রিপল আর বাঁশের বেড়ায় ঘেরা এই অস্থায়ী জীবন কেবল তাদের আশ্রয়হীন করেনি; কেড়ে নিয়েছে তাদের স্বাভাবিক বাড়ন্ত শৈশবও। আন্তর্জাতিক সহায়তার মারাত্মক ঘাটতি, দীর্ঘদিনের অপুষ্টি ও সংক্রামক রোগের দাপটের পাশাপাশি রোহিঙ্গা শিশুদের জীবনে দ্বিতীয় বড় সংকট হয়ে দাঁড়িয়েছে শিক্ষা ও সুরক্ষা। তাদের শারীরিক, মানসিক, সামাজিক ও শিক্ষাগত সংকট এবং তার বিপরীতে তৈরি হওয়া সম্ভাবনার নানা দিক নিয়ে দুই পর্বের বিশেষ প্রতিবেদনের আজ থাকছে শেষটি।শিক্ষা বন্ধ হলে তা কেবল শ্রেণিকক্ষের চারদেয়ালেই সীমাবদ্ধ থাকে না; থমকে যায় একটি শিশুর আগামীর সব স্বপ্ন। রোহিঙ্গা শিশুদের জীবনে খাদ্য ও স্বাস্থ্যের পর সবচেয়ে বড় সংকট হয়ে দেখা দিয়েছে এই শিক্ষা। আন্তর্জাতিক সংস্থা প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল-এর তথ্য অনুযায়ী, ক্যাম্পের এক মিলিয়নের বেশি (১০ লাখের বেশি) জনগোষ্ঠীর মধ্যে অন্তত ৪ লাখ শিশু স্কুলগামী। তাদের জন্য শিক্ষা শুধু ভবিষ্যৎ গড়ার হাতিয়ার নয়, বরং নির্যাতন ও অপরাধ থেকে বাঁচার সুরক্ষাকবচও।২০২৫ সালের জুনে ইউনিসেফ সতর্ক করে জানায়, অর্থসংকটের কারণে প্রায় ২ লাখ ৩০ হাজার রোহিঙ্গা শিশুর শিক্ষা চরম ঝুঁকিতে পড়েছে। ইউনিসেফ-সমর্থিত শিক্ষাকেন্দ্রে যাওয়া শিশুদের অন্তত ৮৩ শতাংশই সরাসরি এই তহবিল সংকটের ক্ষতির মুখে পড়েছে।ক্যাম্পের ১০ লাখের বেশি জনগোষ্ঠীর মধ্যে প্রায় ৪ লাখ শিশু স্কুলগামী হলেও ১.৫ লাখ শিশু এখনও শিক্ষার বাইরে রয়েছে। অন্যদিকে, বাজেট সংকটের কারণে লার্নিং সেন্টারগুলোর বড় একটি অংশ জরাজীর্ণ অবস্থায় রয়েছে এবং নতুন বই ও শিক্ষক নির্দেশিকা কেনা সম্ভব না হওয়ায় পুরোনো বই ও সংকুচিত পাঠ্যসূচিতে শিক্ষা কার্যক্রম চালাতে হচ্ছেতৎকালীন ইউনিসেফ বাংলাদেশ প্রতিনিধি রানা ফ্লাওয়ার্স এ বিষয়ে বলেন, ‘এসব শিশু বিশ্বের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ গোষ্ঠীর অন্যতম। দ্রুত আন্তর্জাতিক অর্থ না এলে শিক্ষাকেন্দ্রগুলো বন্ধ হয়ে যাবে এবং একটি পুরো প্রজন্ম চিরতরে পিছিয়ে পড়ার ঝুঁকিতে পড়বে।’বাস্তবতায় দেখা গেছে, ২০২৫–২৬ শিক্ষাবর্ষে অর্থের অভাবে ছোটদের জন্য নতুন পাঠ্যবই ও শিক্ষক নির্দেশিকা কেনা সম্ভব হয়নি। পুরনো বই ব্যবহার, পাঠ্যসূচি সংকোচন এবং স্বেচ্ছাসেবক শিক্ষকদের ওপর ভর করে কোনোমতে শিক্ষা কার্যক্রম চালু রাখা হয়েছে। ক্যাম্পের ২,০৫১টি লার্নিং ফ্যাসিলিটির মধ্যে ৬৫৪টি মেরামতের জন্য তালিকাভুক্ত হলেও বাজেট সংকটে মেরামত করা গেছে মাত্র ২০০টি। জরাজীর্ণ ও অনিরাপদ হয়ে পড়ায় ২৮৬টি পুনর্নির্মাণের জরুরি প্রয়োজন, আর প্রায় ১৩৯৭টি কেন্দ্র বাজেটের অপেক্ষায় ঝুলছে। ০১০ইউনিসেফ পরিচালিত ‘এডুকেশন সেক্টর’-এর মাধ্যমে বর্তমা*-্ নে ৩ লাখ ২ হাজার ৮০০ শিক্ষার্থী শিক্ষাকার্যক্রমে যুক্ত রয়েছে, যার মধ্যে ১ লাখ ৫৪ হাজার ৪৫০ জন মেয়েশিশু। ২ লাখ ৬৬ হাজার ৪০০ শিশু কিন্ডারগার্টেন থেকে গ্রেড-১২ পর্যন্ত মিয়ানমার কারিকুলামে পড়াশোনা করছে। আশার কথা হলো, প্রথমবারের মতো ৪৭ জন শিক্ষার্থী সফলভাবে ‘গ্রেড-১২’ শেষ করতে যাচ্ছে।এছাড়া, শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনারের (আরআরআরসি) সহযোগিতায় ইউনিসেফ ও এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেন ১,১০০-এর বেশি রোহিঙ্গা স্বেচ্ছাসেবী শিক্ষককে প্রথমবারের মতো আনুষ্ঠানিকভাবে পেশাগত ট্রেনিং সার্টিফিকেট প্রদান করেছে। তবে, মুদ্রার অপর পিঠটি বেশ করুণ। ৫ থেকে ১৮ বছর বয়সী অন্তত ১ লাখ ৫০ হাজারের বেশি রোহিঙ্গা শিশু বর্তমানে যেকোনো ধরনের সহায়তাপ্রাপ্ত শিক্ষার বাইরে রয়েছে। এদের বড় একটি অংশ বেসরকারি কেন্দ্র বা স্থানীয় কওমি মাদ্রাসায় পড়লেও তাদের সঠিক পরিসংখ্যান পাওয়া যায় না।কৈশোরে পৌঁছানোর পর রোহিঙ্গা মেয়েদের পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার পথটি ভীষণ কণ্টকাকীর্ণ হয়ে ওঠে। পারিবারিক অনীহা, পথে সামাজিক হয়রানি, কেন্দ্রের দূরত্ব এবং রক্ষণশীলতার কারণে ঝরে পড়ার হার ব্যাপক।ক্যাম্প-১৭-এর কিশোরী রাজুমা তেমনই এক বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছিল। কো-এডুকেশন বা ছেলে-মেয়েদের একই শ্রেণিকক্ষে পড়ানোর কারণে সামাজিক বাধার মুখে সে পড়াশোনা ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়। পরবর্তীতে কেবল মেয়েদের জন্য আলাদা শিফট বা ক্লাসের ব্যবস্থা করা হলে রাজুমা আবারও পড়াশোনায় ফিরে আসে। এই ঘটনাটি প্রমাণ করে, কেবল স্কুল খুলে দিলেই হবে না, রোহিঙ্গা মেয়েদের সামাজিক ও নিরাপত্তাগত বাস্তবতা মাথায় রেখেই পরিবেশ তৈরি করতে হবে।এসব শিশু বিশ্বের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ গোষ্ঠীর অন্যতম। দ্রুত আন্তর্জাতিক অর্থ না এলে শিক্ষাকেন্দ্রগুলো বন্ধ হয়ে যাবে এবং একটি পুরো প্রজন্ম চিরতরে পিছিয়ে পড়ার ঝুঁকিতে পড়বে।অন্যদিকে, ক্যাম্পের একটি শ্রেণিকক্ষে ১৮ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে মাত্র ৩ জন মেয়ে। তাদেরই একজন ১৪ বছরের সালমা। বাধা টপকে মিয়ানমার কারিকুলামে পড়ার সুযোগ পাওয়াকে সে বড় অর্জন মনে করে। তবে, তার চোখেও তাড়া করে ফেরে অনিশ্চয়তা— ‘যদি টাকা বন্ধ হয়ে যায়, আমাদের স্কুলটাও কি বন্ধ হয়ে যাবে?’ সালমাদের কাছে এই শিক্ষাকেন্দ্র কেবল একটি ঘরের চেয়েও বেশি কিছু; এটি তাদের সহপাঠীদের সঙ্গে দেখা করার স্থান, নিজস্ব ভাষা-সংস্কৃতি চর্চার জায়গা এবং স্বপ্ন দেখার এক টুকরো আকাশ।১২ বছর বয়সী মেহেরজানও তার বর্তমান বস্তিজীবনকে ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করতে দিতে নারাজ। ভিটেমাটি হারানো ও শিবিরের অনিশ্চিত জীবনের মাঝেও সে নিয়মিত ক্লাসে যাচ্ছে। মেহেরজান স্পষ্ট জানায়, ‘রোহিঙ্গা মেয়েদের কাছে শিক্ষা মানে কেবল বইয়ের পাতা ওড়ানো নয়, আত্মমর্যাদা ও অধিকার অর্জনেরও লড়াই।’অত্যন্ত ঘিঞ্জি ও গাদাগাদি পরিবেশে বসবাসকারী এসব রোহিঙ্গা পরিবারে আর্থিক অনটন ও মানসিক চাপের প্রভাব সরাসরি গিয়ে পড়ে শিশুদের ওপর। কিন্তু এই অন্ধকার বাস্তবতার মাঝেও আলো ছড়াচ্ছে ‘পজিটিভ প্যারেন্টিং’ (ইতিবাচক অভিভাবকত্ব)। ৩৮ বছর বয়সী চার সন্তানের জনক হাবি মোহাম্মদ বলেন, ‘দৈনন্দিন জীবনযুদ্ধের কারণে আমরা মা-বাবারা সন্তানদের অনুভূতির দিকে নজর দিতে পারি না। অনেক সময় নিজেদের ভেতরের চাপ ও রাগ সন্তানদের ওপর ঝেড়ে ফেলি। এটি যে মারাত্মক ভুল, তা আগে বুঝতাম না।’এই অন্ধকার বাস্তবতার মাঝেও ‘পজিটিভ প্যারেন্টিং’ বা ইতিবাচক অভিভাবকত্ব ক্যাম্পের চিত্র বদলাতে শুরু করেছে। ইউনিসেফ ও স্থানীয় সহযোগী সংস্থাগুলোর উদ্যোগে প্রায় ২৮ হাজার অভিভাবক, সেবাদানকারী ও ধর্মীয় নেতা এই সেশনে যুক্ত হয়ে সন্তান লালন-পালন ও সুরক্ষায় সচেতন ভূমিকা পালন করছেনহাবি জানান, ২০২৫ সালে বাবাদের জন্য আয়োজিত বিশেষ প্যারেন্টিং সেশনে অংশ নেওয়ার পর থেকে তার চিন্তাভাবনা বদলে গেছে। ‘আমার পঞ্চম শ্রেণিতে পড়া ছেলে ইউসুফ পড়াশোনায় অমনোযোগী ছিল বলে তাকে বকতাম, এমনকি মারধরও করতাম। ভেবেছিলাম ভয় দেখালেই হয়তো কাজ হবে। কিন্তু সেশনে এসে শিখলাম— মারধর না করে ধৈর্য ধরে শিশুদের বোঝাতে হয়, তাদের সঙ্গে বন্ধুত্ব করতে হয়।’হাবি মোহাম্মদের মতোই কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্প ও স্থানীয় আয়োজক জনগোষ্ঠীর (হোস্ট কমিউনিটি) অনেক অভিভাবকই এখন বদলে যাচ্ছেন। ২০২৫ সালের ডিসেম্বর নাগাদ প্রায় ২৮ হাজার অভিভাবক, সেবাদানকারী এবং সামাজিক ও ধর্মীয় নেতা ‘পজিটিভ প্যারেন্টিং’-এর চর্চায় যুক্ত হয়েছেন। এদের মধ্যে রয়েছেন ১৩ হাজারের বেশি মা ও নারী সেবাদানকারী, ১৩ হাজারের বেশি বাবা ও পুরুষ সেবাদানকারী এবং প্রায় ১,৮০০ জন সামাজিক ও ধর্মীয় নেতা।জার্মানির BMZ/KfW-এর অর্থায়নে ইউনিসেফ ও তার সহযোগী সংস্থাগুলো ক্যাম্পগুলোতে এই ইতিবাচক সামাজিক পরিবর্তন আনতে একযোগে কাজ করছে। ইউনিসেফের প্রস্তুত করা সমন্বিত উদ্যোগের অংশ হিসেবে এবং ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব এডুকেশনাল ডেভেলপমেন্টের (BRAC IED) কারিগরি সহায়তায় এই বিশেষ প্যারেন্টিং সেশনগুলো পরিচালিত হচ্ছে। সেশনগুলোতে বাবা-মা ও পরিচর্যাকারীদের শিশুদের সুস্থ বিকাশ, অহিংস উপায়ে সন্তান লালন-পালন, ইতিবাচক পারিবারিক সম্পর্ক এবং শিশুদের মানসিক ও আবেগীয় সুস্থতা নিয়ে দিক-নির্দেশনা দেওয়া হয়।পজিটিভ প্যারেন্টিং সেশন সম্পর্কে কমিউনিটি আউটরিচকর্মী মোহাম্মদ শাহেদুল মুস্তফা বলেন, ‘এখানে বাবারা অনুধাবন করছেন যে সন্তান লালন-পালন কেবল মায়েদের একার দায়িত্ব নয়। কেবল সংসার চালানো বা অর্থনৈতিক জোগান দেওয়া নয়, বরং শিশুদের উপযুক্ত মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে বাবার উপস্থিতিও সমান জরুরি।’সেশনে অংশ নিয়ে অভিজ্ঞতার কথা জানান অভিভাবক মোহাম্মদ আমিন। তিনি বলেন, ‘শিশুর জীবনের প্রথম এক হাজার দিনের সোনালী সময় ও মাতৃদুগ্ধপানের গুরুত্ব আগে এভাবে বুঝিনি। সুস্থ মস্তিষ্ক গঠন ও শারীরিক বৃদ্ধির জন্য জন্মের প্রথম ছয় মাস শিশুকে যে মায়ের দুধ ছাড়া অন্য কোনো শক্ত খাবার দেওয়া যাবে না— তা এখান থেকেই জেনেছি।’পরিবর্তনের এই হাওয়া লেগেছে মায়েদের জীবনেও। প্রশিক্ষণ নেওয়া মা নূরবাহার বলেন, ‘শিশুকে সময়মতো কী কী টিকা দিতে হবে, তা এখান থেকে জেনেছি। শিক্ষার গুরুত্ব এখন নিজের জীবন দিয়েই উপলব্ধি করতে পারি। শিক্ষাই একটি মেয়েকে আত্মনির্ভরশীল করে তোলে এবং নিজের অধিকার বুঝে নেওয়ার শক্তি জোগায়।’কন্যাসন্তানদের স্কুলে পাঠানো, বাল্যবিবাহের কুফল এবং সঠিক যত্ন ও জন্মনিবন্ধনের জন্য স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিরাপদ প্রসবের গুরুত্ব নিয়ে এখন আমি অভিভাবকদের সঙ্গে সরাসরি কথা বলি। ১৮ বছরের কম বয়সী মেয়েরা সন্তান ধারণের জন্য শারীরিকভাবে প্রস্তুত থাকে না। তাই জুম্মার বয়ানসহ সব জায়গায় এখন অভিভাবকদের বোঝাই— বাল্যবিবাহ শিশুর জন্য কতটা মারাত্মক ক্ষতিকর।পিছিয়ে নেই ধর্মীয় নেতারাও। সেশনে অংশ নেওয়া রোহিঙ্গা ধর্মীয় নেতা নূর হোসেন জানান, প্রশিক্ষণটি তাকে সামাজিক নানা বিষয়ে খোলামেলা কথা বলতে অনুপ্রাণিত করেছে। তিনি বলেন, ‘কন্যাসন্তানদের স্কুলে পাঠানো, বাল্যবিবাহের কুফল এবং সঠিক যত্ন ও জন্মনিবন্ধনের জন্য স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিরাপদ প্রসবের গুরুত্ব নিয়ে এখন আমি অভিভাবকদের সঙ্গে সরাসরি কথা বলি। ১৮ বছরের কম বয়সী মেয়েরা সন্তান ধারণের জন্য শারীরিকভাবে প্রস্তুত থাকে না। তাই জুম্মার বয়ানসহ সব জায়গায় এখন অভিভাবকদের বোঝাই— বাল্যবিবাহ শিশুর জন্য কতটা মারাত্মক ক্ষতিকর।’শিক্ষার বাইরে থাকা শিশুরা কেবল পড়াশোনা থেকেই বঞ্চিত হচ্ছে না, জড়িয়ে পড়ছে মারাত্মক সব ঝুঁকিতে। ২০২৫ সালের চতুর্থ প্রান্তিকের ‘যৌথ সুরক্ষা পর্যবেক্ষণ’ (Joint Protection Monitoring) প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ক্যাম্পের ৩৩টি এলাকাতেই শিশুরা শিশুশ্রম, বাল্যবিয়ে, শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন, যৌন সহিংসতা, অপহরণ এবং সশস্ত্র সন্ত্রাসী চক্রে জড়িয়ে পড়ার চরম ঝুঁকিতে রয়েছে।১৬টি ফোকাস দলগত আলোচনায় দেখা গেছে, ১৮১ শিশুর মধ্যে প্রায় ৭২ শতাংশই জানিয়েছে, শিশুশ্রম এখন ক্যাম্পে এক সাধারণ ঘটনা। পরিবারের একমাত্র আয়ক্ষম ব্যক্তিকে হারানো, সীমাহীন দারিদ্র্য এবং শিক্ষার সুযোগ না থাকায় শিশুরা বাধ্য হয়ে শ্রমে নামছে। এছাড়া, ৬৪ শতাংশ শিশু নিজেদের চরম মানসিক ট্রমা ও অবহেলার কথা স্বীকার করেছে।জাতিসংঘ শিশু অধিকার সনদের আলোকে গঠিত চাইল্ড রাইটস মনিটরিং মেকানিজমের (CRMM) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুলাই পর্যন্ত শিশুদের ওপর ১,৪৩৯টি মারাত্মক অধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটেছে, যার শিকার হয়েছে অন্তত ১,৬৪৫ জন শিশু। এর মধ্যে রয়েছে হত্যা, পঙ্গু করা, সশস্ত্র গোষ্ঠীতে জোরপূর্বক নিয়োগ, অপহরণ এবং হাসপাতালে হামলা।সমাজসেবা অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক ও কক্সবাজার রোহিঙ্গা শিশুসুরক্ষা কার্যক্রমের ফোকাল পয়েন্ট কর্মকর্তা শাহী নেওয়াজ এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘রোহিঙ্গা ক্যাম্পে অপুষ্টি, শিশুশ্রম, ধর্ষণ, অপহরণ, শারীরিক নির্যাতন, যৌন হয়রানি, বাল্যবিয়ে এবং আগুন কিংবা ভূমিধসের মতো জলবায়ুজনিত ঝুঁকি হরহামেশা ঘটছে। এর মধ্যে বাল্যবিয়ে, শিশুশ্রম ও ধর্ষণের মতো ঘটনাগুলো এখন চরম উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে।’ঝুঁকিপূর্ণ, সুবিধাবঞ্চিত ও ঝরে পড়া শিশুদের সুরক্ষায় অধিদপ্তরের কার্যক্রম তুলে ধরে তিনি আরও বলেন, ‘অধিদপ্তরের শিশু সুরক্ষা ইউনিটের অধীনে মাঠপর্যায়ে সমাজকর্মীরা নিয়মিত কাজ করছেন। শিশু নির্যাতন, বাল্যবিয়ে বা যৌন হয়রানির সুনির্দিষ্ট তথ্য পেলে আমরা কমিউনিটি বেইজড চাইল্ড প্রটেকশন কমিটি (সিবিসি) এবং উপজেলা শিশু কল্যাণ বোর্ডের মাধ্যমে তা দ্রুত নিষ্পত্তি ও সমাধানের উদ্যোগ নিই। এছাড়া, কোনো শিশু অপরাধের শিকার হলে কিংবা অপরাধের সঙ্গে জড়িয়ে পড়লে, আদালতের মাধ্যমে তাদের কাউন্সেলিং দিয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করা হয়। আচরণ সংশোধন সম্ভব না হলে তাদের কিশোর উন্নয়ন কেন্দ্রে পাঠানো হয়।’পরিচয়হীন বা উদ্ধার হওয়া শিশুদের পুনর্বাসন প্রসঙ্গে তিনি জানান, জন্মের পর পরিত্যক্ত বা কুড়িয়ে পাওয়া শূন্য থেকে ছয় বছর বয়সি শিশুদের বিভাগীয় ‘ছোটমণি নিবাস’ বা বেবি হোমে পাঠানো হয়। অন্যদিকে, পাচারের শিকার কিংবা পতিতালয় থেকে উদ্ধার হওয়া ১৮ বছরের কম বয়সি শিশুদের সমন্বিত শিশু পুনর্বাসন কেন্দ্রে রেখে, ঠিকানা শনাক্ত করে পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়।ক্যাম্পের ৩৩টি এলাকাতেই শিশুরা শিশুশ্রম, বাল্যবিয়ে, অপহরণ ও সশস্ত্র সন্ত্রাসী চক্রের চরম ঝুঁকিতে রয়েছে। এর মধ্যে ২০২৬ সালের প্রথমার্ধেই ১,৪৩৯টি অধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটেছে এবং WHO-এর তথ্য অনুযায়ী জনগোষ্ঠীর ২১.৬ শতাংশ তীব্র মানসিক চাপে ভুগছে, যার প্রধান শিকার ট্রমাগ্রস্ত শিশুরারোহিঙ্গা ক্যাম্পকেন্দ্রিক কাজের পরিধি ও সীমাবদ্ধতার কথা উল্লেখ করে মোহাম্মদ শাহী নেওয়াজ বলেন, ‘ক্যাম্পগুলোতে প্রায় ১২ থেকে ১৪ লাখ রোহিঙ্গা বসবাস করছে এবং প্রতি বছর নতুন করে জন্ম নিচ্ছে প্রায় ২৫ হাজার শিশু। অধিদপ্তরের বর্তমান জনবল দিয়ে এত বিপুলসংখ্যক শিশুর পূর্ণাঙ্গ সুরক্ষা নিশ্চিত করা ভীষণ চ্যালেঞ্জিং। এ কারণে আমাদের কাজের কৌশলে কিছুটা পরিবর্তন আনতে হয়েছে।’কৌশল পরিবর্তনের ব্যাখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, ‘২০১৮ সালের শুরুর দিকে আমাদের মডেলে ফস্টার কেয়ার (Foster Care)-এর ওপর জোর দেওয়া হয়েছিল। যেখানে মিয়ানমার থেকে আসার পর যেসব শিশুর বাবা-মা মারা গেছেন বা নিখোঁজ হয়েছেন, তাদের খুঁজে বের করে ইউনিসেফের আর্থিক সহযোগিতায় আগ্রহী অন্য রোহিঙ্গা পরিবারের জিম্মায় দেওয়া হতো। আর বর্তমান মডেলটি পুরোপুরি ‘কেস ম্যানেজমেন্ট’ ভিত্তিক। এখন ক্যাম্পভিত্তিক কমিটির মাধ্যমে নির্যাতন, যৌন হয়রানি, পারিবারিক নিপীড়ন, বাল্যবিয়ে কিংবা মাদকের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার সুনির্দিষ্ট অভিযোগগুলো চিহ্নিত করে সরাসরি সমাধান করা হচ্ছে।’হতাশার মাঝেও আশা জাগায় কিছু অদম্য চরিত্র। ক্যাম্প-৪ এর ৬০ বছর বয়সী পিতা নূর আলম তার মেয়ে নূর কৈদাকে স্বাবলম্বী করার স্বপ্ন দেখছেন। নূর কৈদা বয়ঃসন্ধিতে পৌঁছানোর পরও সামাজিকভাবে ছড়িয়ে থাকা সব ‘ট্যাবু’ ভেঙে তাকে স্কুলে পাঠাচ্ছেন বাবা। নূর আলম বলেন, ‘আমার কাছে শিক্ষার অর্থ কেবল বর্ণ চেনা নয়; এটি মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি বদলে দেয়। মিয়ানমারে যা আমরা পাইনি, আমার মেয়ে যেন তা থেকে বঞ্চিত না হয়।’তবে, মেয়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে এখনও কিছুটা শঙ্কিত তিনি। আক্ষেপের সুরে নূর আলম বলেন, ‘ক্যাম্পের মেয়ে ও নারীদের স্কুলে কিংবা লার্নিং সেন্টারে যাওয়ার ক্ষেত্রে এখনও পরিবারের পুরুষ সদস্যদের অনুমতির ওপর নির্ভর করতে হয়, যা বড় একটি বাধা।’কুতুপালংয়ের ১৫ বছরের কিশোরী আজিফা যুবকেন্দ্রে গিয়ে স্বাস্থ্য, সচেতনতা ও বাল্যবিয়ে রোধ সম্পর্কে শেখার পর তা ছড়িয়ে দিচ্ছে অন্যান্য মেয়েদের মাঝে। সে জানায়, তার মূল লক্ষ্য ছিল রোহিঙ্গা মেয়েদের এটি বোঝানো যে— নিজের জীবনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার তাদেরও আছে।রোহিঙ্গা ক্যাম্পে অপুষ্টি, শিশুশ্রম, ধর্ষণ, অপহরণ, শারীরিক নির্যাতন, যৌন হয়রানি, বাল্যবিয়ে এবং আগুন কিংবা ভূমিধসের মতো জলবায়ুজনিত ঝুঁকি হরহামেশা ঘটছে। এর মধ্যে বাল্যবিয়ে, শিশুশ্রম ও ধর্ষণের মতো ঘটনাগুলো এখন চরম উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে।পঞ্চাশোর্ধ্ব সৈয়দ আলমের গল্পটা যেন আরও এক ধাপ এগিয়ে। মিয়ানমারে সহিংসতা থেকে বাঁচতে ১৯৯৪ সালেই তিনি কক্সবাজারে আশ্রয় নেন। জন্মভূমি মংডুতে ফেলে আসেন নিজের পুরো জীবন, যেখানে পুরুষদের শিক্ষাই ছিল এক অধরা বিলাসিতা; নারীদের শিক্ষা তো বহু দূরের কথা। চরম আর্থিক অনটন সত্ত্বেও তিনি নিশ্চিত করেছিলেন যেন তার পাঁচ সন্তানের সবাই ক্যাম্পের স্কুলে পড়তে পারে। তাদেরই একজন সামুদা, যার জন্ম ১৯৯৮ সালে কুতুপালং নিবন্ধিত ক্যাম্পে।নিজের সমাজে মেয়েদের স্কুলে পাঠানোকে এখনও আড়চোখে দেখা হয়— উল্লেখ করে সামুদার বাবা সৈয়দ আলম বলেন, ‘আমি চেয়েছি আমার মেয়েরা স্কুলে যাক, শিক্ষিত হয়ে আত্মনির্ভরশীল হোক। যাতে তারা ক্যাম্পের ভেতরে নারীদের ওপর হওয়া যেকোনো সহিংসতার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে পারে। সত্যি বলতে, রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরের পিতৃতান্ত্রিক সামাজিক দেয়াল ভাঙতে একটি মেয়েকে অনেক বেশি শক্তিশালী হতে হয়।’বাবার দেওয়া এই সাহসকে সম্বল করে সামুদা ‘মাইয়া স্কুল’-এর মাধ্যমে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি কন্যাসন্তানদের শিক্ষার পক্ষে প্রচারণায় নেমে পড়ে। বাবার অকুণ্ঠ সহযোগিতাই সামুদাকে উচ্চশিক্ষার দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে দেয়। সেই সামুদা আজ স্বামী ও কন্যাসন্তানকে নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে স্থায়ীভাবে বসবাস করছেন, যা সমগ্র ক্যাম্পের মেয়েদের জন্য এক অনন্য দৃষ্টান্ত।অন্যদিকে, কুতুপালং ক্যাম্প-১-এর ১৮ বছর বয়সী তরুণ কলিম কুসংস্কারাচ্ছন্ন সামাজিক মানসিকতাকে পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান করেছে। সে নিজের ঘর থেকেই পরিবর্তনের সূচনা করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ুয়া ছোট বোন নূর হাসিনাকে পড়ালেখায় সার্বিক সমর্থন জুগিয়ে যাচ্ছে সে।আমি চেয়েছি আমার মেয়েরা স্কুলে যাক, শিক্ষিত হয়ে আত্মনির্ভরশীল হোক। যাতে তারা ক্যাম্পের ভেতরে নারীদের ওপর হওয়া যেকোনো সহিংসতার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে পারে। সত্যি বলতে, রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরের পিতৃতান্ত্রিক সামাজিক দেয়াল ভাঙতে একটি মেয়েকে অনেক বেশি শক্তিশালী হতে হয়—বাবা সৈয়দ আলম কলিম বলে, ‘আমাদের সমাজ মনে করে মেয়েদের আবার পড়ালেখার কী দরকার! কিন্তু আমি চাই আমার বোন মন দিয়ে পড়াশোনা করুক; নিজের আত্মমর্যাদা ও অধিকার শিখুক। সে বড় হয়ে ডাক্তার হোক কিংবা শিক্ষক— নিজের স্বপ্ন ছোঁয়ার পূর্ণ স্বাধীনতা যেন তার থাকে।’ইউনিসেফের প্রতিবেদন অনুযায়ী, রোহিঙ্গা ক্যাম্পের স্কুলগামী ৪ লাখ শিশুর অর্ধেকই মেয়ে। এই মেয়েরা যখন বয়ঃসন্ধিকালে পৌঁছায়, তখন তাদের অধিকাংশই ক্যাম্পের লার্নিং সেন্টারগুলো থেকে ঝরে পড়ে। এই পরিস্থিতিতে, কিশোরী মেয়েদের স্কুলে টিকিয়ে রাখতে পরিবারের পুরুষদের সমর্থন অপরিহার্য।রোহিঙ্গা শিশুদের শরীরে যেমন দৃশ্যমান নানা ক্ষত বা অপুষ্টির চিহ্ন রয়েছে, তেমনই রয়েছে মনের গভীরে এক অদৃশ্য ট্রমা। ডব্লিউএইচও-এর ২০২৫–২৬ সালের জনস্বাস্থ্য মূল্যায়নের তথ্য অনুযায়ী, পুরো রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ২১.৬ শতাংশ মানুষ তীব্র মানসিক চাপে ভুগছেন। অন্যদিকে, তাদের মানসিক স্বাস্থ্য ও মনোসামাজিক সহায়তা (MHPSS) পাওয়ার সুযোগ রয়েছে মাত্র ৪৮.৪ শতাংশের। এই পরিসংখ্যান শিশুদের জন্য আলাদা কিছু নয়; পরিবারের বড়দের মানসিক টানাপোড়েন ও হতাশার প্রত্যক্ষ প্রভাব গিয়ে পড়ে শিশুদের স্বাভাবিক বেড়ে ওঠার ওপর।ইউনিসেফের ২০২৬ সালের মধ্যবর্ষের (Mid-Year) প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কক্সবাজার, ভাসানচর এবং স্থানীয় হোস্ট কমিউনিটিতে শিশু ও অভিভাবকদের জন্য মনোসামাজিক সেবা অব্যাহত রাখা হয়েছে। এর মধ্যে কেবল কক্সবাজার ও ভাসানচরের ৮৩ হাজারের বেশি শিশু ও অভিভাবক এই সহায়তা পেয়েছেন। তবে ‘সুরক্ষা পর্যবেক্ষণ’ ও ‘বাংলাদেশ মানবিক পরিস্থিতি প্রতিবেদন (মধ্যবর্ষ ২০২৬)’ অনুযায়ী, ক্যাম্পগুলোতে মানসিক চাপের কারণ বা উৎসগুলো কমেনি। প্রতিনিয়ত নিরাপত্তাহীনতা, অগ্নিকাণ্ড, পাহাড়ধস ও ঝড়ের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগের পাশাপাশি শিশুশ্রম, অবহেলা, সহিংসতা, অপহরণ, সশস্ত্র গোষ্ঠীর ভয় ও বাল্যবিবাহ শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্যকে মারাত্মক ঝুঁকির মুখে ফেলছে।চলতি ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসেই ক্যাম্পগুলোতে শিশুদের অধিকার লঙ্ঘনের ১,৪৩৯টি মারাত্মক ঘটনা রেকর্ড করা হয়েছে, যার শিকার হয়েছে অন্তত ১,৬৪৫ জন শিশু। অপহরণ, সন্ত্রাসীচক্রে জোরপূর্বক ব্যবহার ও যৌন সহিংসতার শিকার হয়ে এসব শিশু চরম মনস্তাত্ত্বিক ট্রমায় দিন কাটাচ্ছে। বাবার দেওয়া এই সাহসকে সম্বল করে সামুদা ‘মাইয়া স্কুল’-এর মাধ্যমে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি কন্যাসন্তানদের শিক্ষার পক্ষে প্রচারণায় নেমে পড়ে। বাবার অকুণ্ঠ সহযোগিতাই সামুদাকে উচ্চশিক্ষার দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে দেয়। সেই সামুদা আজ স্বামী ও কন্যাসন্তানকে নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে স্থায়ীভাবে বসবাস করছেন, যা সমগ্র ক্যাম্পের মেয়েদের জন্য এক অনন্য দৃষ্টান্ত।এমন পরিস্থিতিতে শিক্ষাকেন্দ্রে শিশুদের মনস্তাত্ত্বিক সংকট শনাক্ত ও দ্রুত সহায়তা দিতে শিক্ষকদের বিশেষ প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি শিক্ষকদের মানসিক স্বাস্থ্য ও মনস্তাত্ত্বিক বিষয়ে প্রস্তুত করা হচ্ছে, যার আওতায় ইউনিসেফ ইতোমধ্যে ১৭৭ জন নারী ও ২৪ জন পুরুষ শিক্ষককে প্রশিক্ষণ দিয়েছে।একই সময়ে ক্যাম্পে ৮৩ হাজার শিশু ও পরিচর্যাকারী মনোসামাজিক সহায়তা; ৫ হাজার ৩০০ শিশু ‘চাইল্ড-প্রটেকশন কেস ম্যানেজমেন্ট’ এবং ১৭ হাজার ১০০ জন নারী ও শিশু জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতা (GBV) প্রতিরোধমূলক সুরক্ষার আওতায় এসেছে।আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা ‘অ্যাকশনএইড’ কক্সবাজারে রোহিঙ্গা ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জন্য পরিচালিত ‘হেলথ অ্যান্ড জেন্ডার সাপোর্ট প্রজেক্ট’-এর আওতায় জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতা প্রতিরোধ, কেস ম্যানেজমেন্ট, রেফারেল সেবা ও মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা নিশ্চিত করতে কাজ করছে। সংস্থাটির পরিচালিত ‘উইমেন ফ্রেন্ডলি স্পেস’ (WFS) ও ‘ওয়ান-স্টপ ক্রাইসিস সেন্টার’ (OCC)-এর মাধ্যমে ৬,৬৯০ জন নারী ও কিশোরী ব্যক্তিগত পর্যায়ে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা পেয়েছেন। এছাড়া, সুনির্দিষ্ট বা পরিকল্পিত গ্রুপ সেশনের মাধ্যমে আরও ৭৩৩ জন নারী ও কিশোরী সরাসরি মনোসামাজিক সহায়তায় যুক্ত হয়েছেন।কক্সবাজার সদর হাসপাতালের ওয়ান-স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারে (ওসিসি) মানসিক স্বাস্থ্য ও মনোসামাজিক সহায়তা কাউন্সিলর হিসেবে কর্মরত উপমা দাস এ বিষয়ে ঢাকা পোস্টকে বলেন, ‘রোহিঙ্গা শিশুরা মূলত সামাজিক ও সাধারণ— এই দুই কারণে বিষণ্ণতা ও মানসিক দুশ্চিন্তায় ভোগে। সামাজিক কারণের মধ্যে রয়েছে ধর্মান্ধতা, কুসংস্কার ও বয়ঃসন্ধিকালীন ভয়। তবে, সাধারণ বা পারিপার্শ্বিক কারণগুলো আরও বেশি মারাত্মক; যেমন— নির্যাতন, নিপীড়ন, ধর্ষণ, হত্যা ও পারিবারিক বিচ্ছেদ। এর মধ্যে বাল্যবিবাহ ও ধর্ষণের মতো ঘটনায় শিশুরা চরম শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ে।’ক্যাম্পের করুণ চিত্র তুলে ধরে তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের ওসিসিতে বাল্যবিবাহ ও ধর্ষণের শিকার রোগীই বেশি আসে। চরম বাস্তব হলো— ১৮ বছরের নিচে যে কেউ-ই শিশু, এই ধারণাটুকুই সমাজে স্পষ্ট নয়। অথচ চার বা পাঁচ বছরের শিশু ধর্ষণের মতো ভয়াবহ ঘটনাও ঘটছে। এই বয়সে ট্রমাগ্রস্ত হলে শিশুরা ইতিবাচক চিন্তা করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে, পড়ালেখায় মারাত্মক ব্যাঘাত ঘটে এবং মনে স্থায়ী নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হয়। এক কথায়, সামাজিক চাপ ও চরম দারিদ্র্য রোহিঙ্গা শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্যকে মারাত্মকভাবে ভঙ্গুর করে তুলেছে।’মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষায় ‘পজিটিভ প্যারেন্টিং’-এর ওপর গুরুত্ব দিয়ে উপমা দাস বলেন, ‘অনেক রোহিঙ্গা অভিভাবক জানেনই না জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতা কী বা শিশুর মন মনস্তাত্ত্বিকভাবে কী চায়। অভিভাবকের কটু আচরণ বা রাগ যে শিশুর ওপর কতটা নেতিবাচক প্রভাব ফেলে, তা তাদের বোঝাতে হবে। শিশুদের কথা শুনতে হবে, তাদের অধিকার দিতে হবে এবং ভুল করলে বকাঝকা বা দোষারোপ করা বন্ধ করতে হবে; নইলে শিশুদের মধ্যে নিজের প্রতি অপরাধবোধ তৈরি হয়। সর্বোপরি, অভিভাবকদের জীবিকা ও খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি সচেতনতা ও শিক্ষার বিস্তৃত পরিবেশ তৈরি করতে পারলে শিশুদের এই মানসিক জটিলতা অনেকাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব।’পাহাড় কেটে বানানো ঘিঞ্জি ক্যাম্পগুলোতে বসবাসকারী শিশুদের জন্য বর্ষাকাল মানেই আতঙ্ক। অতিবৃষ্টির ফলে দেখা দেয় ভয়াবহ পাহাড়ধস, আকস্মিক বন্যা, বিশুদ্ধ পানির সংকট ও পানিবাহিত রোগ।২০২৬ সালের জুলাই মাসে এই প্রাকৃতিক ঝুঁকি প্রাণঘাতী রূপ নেয়। ৭ জুলাই আকস্মিক বন্যা ও ধসে ক্যাম্পে নয়জনের মৃত্যু হয়। পরদিনই (৮ জুলাই) ক্যাম্প-৫-এ পাহাড়ধসে চাপা পড়ে চার কিশোরীর করুণ মৃত্যু হয়।আমাদের ওসিসিতে বাল্যবিবাহ ও ধর্ষণের শিকার রোগীই বেশি আসে। চরম বাস্তব হলো— ১৮ বছরের নিচে যে কেউ-ই শিশু, এই ধারণাটুকুই সমাজে স্পষ্ট নয়। অথচ চার বা পাঁচ বছরের শিশু ধর্ষণের মতো ভয়াবহ ঘটনাও ঘটছেজাতিসংঘ শিশু তহবিল (ইউনিসেফ) এক বিবৃতিতে সতর্ক করে জানায়, এই অকাল মৃত্যুগুলোকে কেবল ‘প্রাকৃতিক দুর্যোগ’ হিসেবে দেখলে আসল সত্য আড়াল হয়ে যাবে। অতিরিক্ত ঘনবসতি, অপরিকল্পিত অবকাঠামো এবং দুর্যোগ মোকাবিলায় বাজেটের চরম ঘাটতির ফলেই শিশুরা প্রতি বছর এভাবে অকালে প্রাণ হারাচ্ছে।রোহিঙ্গা শিশুদের এই বহুমুখী সংকট মোকাবেলায় বিশেষজ্ঞরা দ্রুত মানবিক সহায়তা বাড়ানো ও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার জোর দাবি জানিয়েছেন। অভিবাসন ও শরণার্থীবিষয়ক বিশ্লেষক আসিফ মুনীর ঢাকা পোস্টকে বলেন, ‘কেবল রোহিঙ্গা শিশু নয়, বিশ্বের যেকোনো শিশুর শারীরিক ও মানসিক বিকাশে সঠিক পুষ্টির কোনো বিকল্প নেই। তবে, অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয় হলো, আন্তর্জাতিক দাতাসংস্থাগুলোর আর্থিক সহায়তা আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে। ফলে ক্যাম্পে রোহিঙ্গারা, বিশেষ করে শিশুরা মারাত্মক অপুষ্টির শিকার হচ্ছে। এ সংকট নিরসনে বাংলাদেশ সরকার, ইউনিসেফসহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে দ্রুত কার্যকর গুরুত্ব দিতে হবে।’শিক্ষার পাশাপাশি মানসিক স্বাস্থ্যের গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি আরও বলেন, ‘শিক্ষার পাশাপাশি রোহিঙ্গা শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর বিশেষ জোর দিয়ে তহবিল বাড়াতে হবে। শিবিরের প্রতিকূল পরিবেশ ও অনিশ্চয়তার কারণে অধিকাংশ শিশু গভীর মনস্তাত্ত্বিক ট্রমায় ভুগছে। এসব সমস্যা দ্রুত শনাক্ত করে মানসিক স্বাস্থ্য যে শারীরিক স্বাস্থ্যের মতোই সমান গুরুত্বপূর্ণ, তা রোহিঙ্গা কমিউনিটির কাছে স্পষ্ট করা জরুরি। প্রতিটি পরিবার যদি শিক্ষা ও স্বাস্থ্যকে প্রাধান্য দেয়, তবে বহু সমস্যার সমাধান সহজ হয়ে যাবে।’শিক্ষার পাশাপাশি রোহিঙ্গা শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর বিশেষ জোর দিয়ে তহবিল বাড়াতে হবে। শিবিরের প্রতিকূল পরিবেশ ও অনিশ্চয়তার কারণে অধিকাংশ শিশু গভীর মনস্তাত্ত্বিক ট্রমায় ভুগছে। এসব সমস্যা দ্রুত শনাক্ত করে মানসিক স্বাস্থ্য যে শারীরিক স্বাস্থ্যের মতোই সমান গুরুত্বপূর্ণ, তা রোহিঙ্গা কমিউনিটির কাছে স্পষ্ট করা জরুরি।অভিবাসন ও শরণার্থীবিষয়ক বিশ্লেষক আসিফ মুনীরশিক্ষার সুযোগবঞ্চিত শিশুদের বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে আসিফ মুনীর বলেন, ‘শিক্ষার বাইরে থাকা দেড় লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা শিশুর বিষয়টি অত্যন্ত আশঙ্কাজনক। এত বিপুলসংখ্যক শিশুকে অনতিবিলম্বে যেকোনো উপায়ে আনুষ্ঠানিক কিংবা অনানুষ্ঠানিক শিক্ষার আওতায় ফিরিয়ে আনা প্রয়োজন। তবে, সব সংকটের টেকসই সমাধান লুকিয়ে আছে টেকসই ও সম্মানজনক প্রত্যাবাসনে। সম্প্রতি জাতিসংঘে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ইতিবাচক বক্তব্য রেখেছেন। আন্তর্জাতিক অর্থসহায়তা জোরদারের পাশাপাশি এখন দ্রুত প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া শুরু করা উচিত।’একই প্রসঙ্গে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ এস এম আমানুল্লাহ ঢাকা পোস্টকে বলেন, ‘একটি শিশুর পূর্ণাঙ্গ মানুষ হিসেবে বেড়ে ওঠার জন্য কেবল খাদ্য, বস্ত্র কিংবা ভৌগোলিক নিরাপত্তাই যথেষ্ট নয়। তার সমান প্রয়োজন ভালোবাসা, যত্ন, উপযুক্ত শিক্ষা, সুস্থ বিনোদন এবং নিজের মনের কথা ব্যক্ত করার অবাধ স্বাধীনতা। শিশুর অধিকারকে বিচ্ছিন্ন কোনো বিষয় হিসেবে দেখার সুযোগ নেই; কারণ একটি শিশুর সর্বাঙ্গীণ বিকাশের সঙ্গে শিক্ষা, সংস্কৃতি, সৃজনশীলতা ও সামাজিক সুরক্ষার বিষয়গুলো ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে রয়েছে।’অস্ট্রেলিয়া সরকার বাংলাদেশে রোহিঙ্গা শিশু ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জীবন রক্ষাকারী সেবা অব্যাহত রাখতে ইউনিসেফকে ১ কোটি ১৪ লাখ মার্কিন ডলার (১ কোটি ৬০ লাখ অস্ট্রেলিয়ান ডলার) অর্থ সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। ২০২৬ সালের এপ্রিল থেকে ২০২৮ সাল পর্যন্ত কিস্তিতে প্রদত্ত এই অর্থ কক্সবাজার ও ভাসানচরে স্বাস্থ্য, পুষ্টি, শিক্ষা, পানি, স্যানিটেশন ও সুরক্ষা নিশ্চিত করবে।তহবিল সংকটের মুখে এই সহায়তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। বাংলাদেশে নিযুক্ত অস্ট্রেলিয়ার হাইকমিশনার সুসান রাইল বলেন, সংকট মোকাবিলায় অস্ট্রেলিয়া প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। ইউনিসেফ প্রতিনিধি রানা ফ্লাওয়ার্স এই অনুদানের জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে জানান, তহবিলের অভাবে একটি প্রজন্ম হারিয়ে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছিল। এই নমনীয় তহবিল ইউনিসেফকে দ্রুত সাড়া দিতে ও সংকট মোকাবিলায় সহায়তা করবে।উল্লেখ্য, ২০২৫ সালে প্রয়োজনীয় তহবিলের মাত্র ৪৬ শতাংশ পাওয়া গেলেও ৬ লাখ ৩৭ হাজারেরও বেশি মানুষকে সেবা দিয়েছে ইউনিসেফ। তবে, ২০২৬ সালে ১ কোটি ৩৫ লাখ ডলারের ঘাটতি এখনও বড় চ্যালেঞ্জ। অস্ট্রেলিয়ার এ নতুন সহায়তা রোহিঙ্গা ও বাংলাদেশি শিশুদের অধিকার এবং নিরাপদ ভবিষ্যৎ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।