প্রিন্ট এর তারিখ : ১৮ অক্টোবর ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ১৮ অক্টোবর ২০২৬
তেলের দামে রাইড শেয়ারিংয়ে বাড়তি চাপা
জেড-আর মানিক, নিজস্ব প্রতিবেদক ||
জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির ব্যাপক প্রভাব পড়েছে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায়। গণপরিবহনে বাড়তি ভাড়ার পাশাপাশি রাইড শেয়ারিংয়েও বেড়েছে খরচ।তবে চালকদের অভিযোগ, জ্বালানি তেলের দাম দুই দফায় বাড়লেও সেই অনুপাতে রাইড শেয়ারিং অ্যাপগুলোতে ভাড়া বাড়েনি। বরং যাত্রীদের দেওয়া ডিসকাউন্ট ও অ্যাপের কমিশন কাটার পর হাতে থাকা অর্থ দিয়ে জ্বালানি, গাড়ির রক্ষণাবেক্ষণ ও সংসারের খরচ চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে।এদিকে যাত্রীদের ভাষ্য, জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধির সঙ্গে রাইড শেয়ারিংয়ের ভাড়াও কিছুটা বেড়েছে। একই সঙ্গে গত দেড় বছরে অ্যাপগুলোতে ডিসকাউন্টের পরিমাণও অনেক কমেছে। এমনকি কয়েকজন যাত্রী অভিযোগ করেছেন, অ্যাপে দেখানো ভাড়ার চেয়ে কখনও বেশি টাকা পরিশোধের ঘটনাও ঘটছে।সম্প্রতি রাজধানীর গুলিস্তান, মানিকনগর ও কুড়িলসহ কয়েকটি এলাকায় সরেজমিনে রাইড শেয়ারিং চালক ও যাত্রীদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।চালকদের ভাষ্য, তেলের দাম লিটারপ্রতি ৮৯-৯০ টাকা থাকার সময় রাইড শেয়ারিং অ্যাপগুলোতে যে ভাড়া পাওয়া যেত, বর্তমানে অকটেনের দাম ১৬৫ টাকা হওয়ার পরও অ্যাপের ভাড়া তেমন বাড়েনি। ফলে জ্বালানির বাড়তি ব্যয়ের সঙ্গে আয়ের সামঞ্জস্য থাকছে না।গুলিস্তানে কথা হয় চালক আবু সিদ্দিক নামে এক মোটরসাইকেলে চালকের সঙ্গে। তিনি রাইড শেয়ারিং করেই পাঁচজনের সংসার চালান। বর্তমানে রাইড শেয়ারিং করে তার স্ত্রী-সন্তানের খরচ চালাতে হিমশিম খাচ্ছেন আক্ষেপ করে আবু সিদ্দিক যুগান্তরকে বলেন, ‘তেলের দাম ৯০ টাকা যখন ছিল, তখনও পাঠাওয়ে যে ভাড়া ছিল, এখন তেলের দাম ১৬৫ টাকা, তবুও সেই ভাড়াই আছে। এর ওপর যাত্রীদের ডিসকাউন্ট দেওয়া হয়। ফলে তেলের খরচ অনুযায়ী ন্যায্য ভাড়া পাই না।’তিনি বলেন, ‘জ্বলানি বৃদ্ধির সঙ্গে বেড়েছে মোটর পার্সের দামও। এক মাস গাড়ি চালালে সার্ভিসিং করাতে হয়। তাতে ৬-৭ হাজার টাকা চলে যায়। সবকিছুরই দাম বাড়ে, শুধু বাড়ে না আমাদের আয়।’ধানমন্ডির ল্যাবএইড থেকে বিমানবন্দর পর্যন্ত একটি রাইডের হিসাব তুলে ধরে আবু সিদ্দিক বলেন, ‘ভাড়া হয়েছিল ২৫০ টাকা। যাত্রী ১০০ টাকা ডিসকাউন্ট পেয়েছে। অ্যাপ কমিশন নেবে ৩০ টাকা। আমি পেলাম মাত্র ১২০ টাকা। আমি যে জ্যাম ঠেলে ১৮ কিলোমিটার চালিয়ে আসলাম, আমার সেই খরচই উঠে নাই।’কুড়িল বিশ্ব রোড় এলাকায় দেখা যায়, যাত্রীর অপেক্ষায় সারি সারি মোটরসাইকেল দাড়িয়ে আছে। অনেক্ষণ পর পর একজন যাত্রী পেলেই সব রাইডারই ভাড়া নেওয়ার চেষ্টা করছেন।কাওসার আহমেদ সাব্বির নামে এক চালকের সঙ্গে কথা হলে তিনি যুগান্তরকে বলেন, ‘রাইডের ভাড়া কম হওয়ায় চালকদের সঙ্গে যাত্রীদের প্রায়ই কথাকাটাকাটি হয়। যাত্রীরা বলে, অ্যাপে কম ভাড়া আসে, আপনারা কন্ট্রাকে বেশি চান। কিন্তু আমরা যে খরচ করে গাড়ি চালাই, সেটা তো তাদেরও বুঝতে হবে।’দর কষাকষি বেড়েছে যাত্রী ও রাইডারের মধ্যে। সংগৃহীত ছবিকাওসার বলেন, আজকে সকাল থেকে ট্রিপ মারছি ৪৬৫ টাকা। এর মধ্যে তেলের খরচ আছে, নিজের খরচ আছে—প্রায় ৩০০ টাকা চলে যায়। এরপর বাইকের পার্টস লাগাতে হবে। সব মিলিয়ে শূন্য হাতে বাসায় যেতে হয়। আবার কাল সকালে ধার করে তেল নিয়ে রাস্তায় নামতে হবে।একই এলাকায় আরেক মোটরসাইকেল চালক গাজি বলেন, ‘কম ভাড়ার পাশাপাশি যাত্রী সংকটও রয়েছে। বিকেল ৪টা থেকে বসে আছি। এখন সন্ধ্যা ৭টা বাজে। একটা যাত্রীও নাই। যাত্রী পেলেও ভাড়ায় মিলে না। তাই যাই না, বসে থাকি।’তিনি জানান, অধিকাংশ চালক কিস্তিতে মোটরসাইকেল কিনেছে। ফলে সংসার চালানো পাশাপাশি প্রতিমাসে কিস্তি পরিশোধের চাপ। সেই জন্য অনেকেই কম ভাড়া পেলেও বাধ্য হয়ে রাইড নিয়ে যায়। ’মানিকনগর এলাকায় কথা হয় হৃদয় নামে এক মোটরসাইকেল চালকের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘জ্বালানি তেলের পাশাপাশি মোটরসাইকেলের যন্ত্রাংশের দামও বেড়েছে। আগে বাইকের যে পার্টস ৫০০ টাকায় কিনছি, এখন সেটার দাম এক হাজারে। আমাদের ইনকাম বাড়েনি, কিন্তু জিনিসের দাম ঠিকই বাড়ছে।’ব্যয় সামাল দিতে না পেরে পরিবারের সদস্যদের গ্রামের বাড়িতে পাঠিয়ে একা ঢাকায় থাকার কথাও জানান তিনি। হৃদয় বলেন, ‘আগে বউ-বাচ্চা নিয়ে ঢাকায় থাকতাম। এখন খরচ চালাতে পাচ্ছি না। ওদের গ্রামে পাঠায় দিছি। আমি একলা ঢাকা থাকি।’সিংহভাগ চালকদের অভিযোগ, অ্যাপের মাধ্যমে রাইড নেওয়ার সময় গন্তব্যে পৌঁছানোর আগে প্রকৃত ভাড়া ও ডিসকাউন্টের বিষয়টি অনেক ক্ষেত্রে স্পষ্ট থাকে না। রাইড শেষে দেখা যায়, যাত্রীকে ডিসকাউন্ট দেওয়া হয়েছে। আবার অ্যাপের বাইরে সরাসরি যাত্রী নিলে ভাড়া নিয়ে অনেক্ষণ দর কষাকষি করতে হয়।রাস্তায় ট্রাফিক পুলিশের হয়রানি নিয়েও ক্ষোভ রয়েছে চালকদের মধ্যে। এক চালক বলেন, ‘একটা বাস দাঁড়ায় যাত্রী নিতে পারে, আমরা দাঁড়ালেই মামলা খাই। একটু উনিশ-বিশ হলেই ট্রাফিক সার্জেন্ট মামলা দিয়ে দেয়। মামলা খাইলেই ২ হাজার টাকা নাই।’তবে চালকদের এসব অভিযোগের প্রেক্ষতে যাত্রীদের রয়েছে বিপরীত বক্তব্যে। কয়েকজন যাত্রী জানান, আগের তুলনায় রাইড শেয়ারিংয়ের ভাড়া কিছুটা বেড়েছে। একই সঙ্গে গত এক থেকে দেড় বছরে ডিসকাউন্টের পরিমাণও উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।সজিব নামে যাত্রী বলেন, ‘আগের তুলনায় ভাড়া কিছুটা বেড়েছে। সেই সঙ্গে পাঠাও-উবার অ্যাপসে কমেছে ডিসকাউন্ট অফার। এক-দেড় বছরে শতাধিক রাইডে মাত্র ১০ শতাংশ হাড়ে দুইবার ডিসকাউন্ট পেয়েছি। ’মানিকনগরের সানজিদা আক্তার নামে এক নারী যাত্রী জানান, অ্যাপে দেখানো ভাড়ার চেয়ে বেশি টাকা দেওয়ার ঘটনাও তার সঙ্গে দু-একবার ঘটেছে। অ্যাপের বাইরে সরাসরি রাইড নিলে তেলের দাম বাড়ার অজুহাতে বেশি ভাড়া চাওয়ার অভিযোগও করেন তিনি।তার ভাষায়, ‘যেখানে ভাড়া ১৫০ টাকা, সেখানে ৩০০ টাকারও বেশি চাওয়া হয়।’তেলের দাম বাড়ার পর রাইড শেয়ারিং ব্যবহার কমেছে কি না জানতে চাইলে ওই যাত্রী বলেন, ‘ব্যয়ের সঙ্গে আমাদের আয় বাড়েনি। ফলে অনেক সময় ব্যয়টাও হিসাব করে করতে হয়। তবুও প্রয়োজন ব্যধে বাড়তি টাকায় রাইড নিতে হয়।’রাইড শেয়ারিং অ্যাপসগুলোতে ভাড়া নির্ধারণে পিক আওয়ার ও নন-পিক আওয়ারের প্রভাব রয়েছে বলেও জানান অনেক যাত্রী।আসাদুল নামে এক যাত্রী বলেন, ‘ভাড়াটা আসলে পিক আওয়ার আর নন-পিক আওয়ারের ওপর কম-বেশি হয়। আবার জ্যামের কারণেও বাড়তি ভাড়া দেখানো হয়। অ্যাপে ভাড়া কখনোই নির্দিষ্ট ছিল না।’এ বিষয়ে জানতে চাইলে পাঠাওয়ের জনসংযোগ ব্যবস্থাপক (পিআর ম্যানেজার) মো. ফয়েজ কোনো মন্তব্য করতে চাননি। উবার বাংলাদেশের কান্ট্রি হেড এস এম জামশেদ হাসানের সঙ্গেও যোগাযোগ করা হলে, তিনি এ বিষয়ে কোনো কথা বলেননি।
সম্পাদক ও প্রকাশকঃ মো: মনিরুজ্জামান (মনির)
কপিরাইট © ২০২৬ দৈনিক রেলওয়ে বার্তা । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত