ঢাকা   বুধবার, ০১ এপ্রিল ২০২৬
দৈনিক রেলওয়ে বার্তা

অপরাধ

রেলওয়ের অনবোর্ড টেন্ডার ঘিরে বিতর্ক তুঙ্গে

বাংলাদেশ রেলওয়ের একাধিক আন্তঃনগর ট্রেনে ভৌতসেবা (অনবোর্ড সার্ভিস) প্রদান সংক্রান্ত টেন্ডার প্রক্রিয়াকে ঘিরে গুরুতর অনিয়ম, অস্বচ্ছতা, প্রশ্নবিদ্ধ দরপ্রস্তাব এবং প্রায় ৪০ লাখ টাকার আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ সামনে এসেছে। অস্বাভাবিকভাবে কম দর, লভ্যাংশবিহীন প্রস্তাব, সর্বনিম্ন দরদাতাকে কাজ না দেওয়া এবং নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানের পক্ষে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ—সব মিলিয়ে পুরো টেন্ডার প্রক্রিয়া এখন গভীর প্রশ্নের মুখে।অস্বাভাবিক দরপ্রস্তাব: বাস্তবতা না পরিকল্পিত কারসাজি? গত ১৩ অক্টোবর ২০২৫ তারিখে জাহানাবাদ ও রূপসী বাংলা এক্সপ্রেস ট্রেনের অনবোর্ড সার্ভিস টেন্ডার খোলার সময় প্রথম অস্বাভাবিকতা সামনে আসে। টেন্ডার নথি বিশ্লেষণে দেখা যায়, কয়েকটি প্রতিষ্ঠান এমন দরপ্রস্তাব দিয়েছে যেখানে তারা কোনো লভ্যাংশ তো নিতেই চায়নি, বরং মালামাল ব্যয় ও অতিরিক্ত ২ শতাংশ কন্টিনজেন্সি খরচও দেখায়নি।নথি অনুযায়ী আলোচনায় থাকা প্রতিষ্ঠানগুলো হলো—হাবিব বানিজ্য বিতান, এইচ এন্ড এইচ, পাইওনিয়ার এন্টারপ্রাইজ, শাহ আমানত এন্টারপ্রাইজ, আইসিডি ক্যান্টিন এবং জান্নাত ট্রেডিং। এসব প্রতিষ্ঠানের প্রস্তাবিত দর প্রশাসনিকভাবে নির্ধারিত ন্যূনতম ব্যয়েরও নিচে।টেন্ডারের সিডিউলের ৪৮ নম্বর পৃষ্ঠায় সেকশন-৬ অনুযায়ী, ১১টি কোচে ১,৭১৬ রাউন্ড ভৌতসেবা এবং অতিরিক্ত ৩৪ রাউন্ড ট্রিপের ব্যয় উল্লেখ রয়েছে। ৪৯ ও ৫০ নম্বর পৃষ্ঠায় শ্রমিক মজুরি, প্রশাসনিক খরচসহ অন্যান্য ব্যয়ের বিশদ বিবরণ রয়েছে। এসব নির্ধারিত খরচ বাদ দিয়েও ন্যূনতম ব্যয় দাঁড়ায় প্রায় ৩৩ লাখ ২১ হাজার ২৫০ টাকা—কিন্তু সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রস্তাবিত দর তারও নিচে।একই প্রবণতা দেখা গেছে একতা এক্সপ্রেস, রংপুর এক্সপ্রেস এবং সুন্দরবন এক্সপ্রেস ট্রেনের ক্ষেত্রেও। একই প্রতিষ্ঠানগুলোর পুনরাবৃত্তি একটি সুসংগঠিত দরপত্র কৌশলের ইঙ্গিত দেয়।“লোকসান দিয়ে ব্যবসা”—নাকি অপ্রকাশিত আয়ের উৎস?বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনো প্রতিষ্ঠান দীর্ঘমেয়াদে লভ্যাংশ ছাড়া ব্যবসা পরিচালনা করতে পারে না। ফলে এত কম দর দেওয়ার পেছনে বিকল্প আয়ের উৎস থাকার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।মাঠপর্যায়ের তথ্য আরও উদ্বেগজনক। কয়েকজন ট্রেন স্টুয়ার্ড জানিয়েছেন, অনেক ক্ষেত্রে ঠিকাদাররা তাদের কাছ থেকে মাসিক ৭০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা পর্যন্ত আদায় করে থাকে। কিছু ক্ষেত্রে বেতন ব্যাংকে জমা হলেও তা বাস্তবে ভোগ করতে না পারার অভিযোগও রয়েছে।যদি এসব অভিযোগ সত্য হয়, তবে এটি কেবল শ্রমিক শোষণ নয়—বরং টেন্ডার প্রক্রিয়ার আড়ালে একটি অপ্রাতিষ্ঠানিক অর্থনৈতিক চক্র সক্রিয় থাকার ইঙ্গিত দেয়।অনবোর্ড সার্ভিস দরপত্রে ৪০ লাখ টাকার লেনদেন: অভিযোগের সত্যতা কতটা?বাংলাদেশ রেলওয়ের চারটি গুরুত্বপূর্ণ এক্সপ্রেস ট্রেন—একতা, রংপুর, সুন্দরবন ও জাহানাবাদ—এর অনবোর্ড সার্ভিস টেন্ডারকে ঘিরে প্রায় ৪০ লাখ টাকা লেনদেনের অভিযোগ সম্প্রতি একটি অনলাইন নিউজ পোর্টালের প্রতিবেদনের মাধ্যমে আলোচনায় আসে।তবে এই অভিযোগ ঘিরে মতভেদও রয়েছে। রেলওয়ের কিছু কর্মচারী সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনের মন্তব্য অংশে দাবি করেছেন, ৪০ লাখ টাকার লেনদেনের বিষয়টি “মিথ্যা, বানোয়াট ও ভিত্তিহীন”। অন্যদিকে অভিযোগকারীদের সূত্র বলছে, নির্দিষ্ট কিছু প্রতিষ্ঠানকে সুবিধা দিতে প্রশাসনিক প্রভাব খাটানো হচ্ছে।এই অভিযোগে রেলওয়ের এডিজি (অপারেশন) মোহাম্মদ নাজমুল ইসলাম এবং চিফ কমার্শিয়াল ম্যানেজার (পশ্চিম) সুজিত কুমার বিশ্বাসের নাম উঠে এসেছে। তবে এখনো পর্যন্ত অভিযোগগুলো আনুষ্ঠানিকভাবে প্রমাণিত হয়নি।অভিযোগকারীদের দাবি অনুযায়ী—হাবিব বাণিজ্য বিতানকে দুটি ট্রেন, শাহ আমানত এন্টারপ্রাইজকে একটি, এবং শাহ আলমের মালিকানাধীন একটি প্রতিষ্ঠানকে একটি ট্রেন দেওয়ার চেষ্টা চলছে। তবে এসব দাবি এখনো প্রমাণসাপেক্ষ এবং সরাসরি প্রামাণ্য নথি ছাড়া নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না।একই সঙ্গে BOQ (Bill of Quantities) ও সংশোধন প্রক্রিয়া নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, কিছু প্রতিষ্ঠান কনটিনজেন্সি, মালামালের মূল্য, লভ্যাংশ এবং ২০% ভ্যাট-ট্যাক্স উল্লেখ না করেও সুবিধা পাচ্ছে। যদিও বিদ্যমান নিয়ম অনুযায়ী টেন্ডার কমিটি এসব বিষয় যাচাই-বাছাই করার ক্ষমতা রাখে—তাই এটি সরাসরি অনিয়ম প্রমাণ না হলেও সন্দেহের যথেষ্ট অবকাশ তৈরি করে।সাংবাদিকতার সীমাবদ্ধতা ও তথ্য যাচাইয়ের প্রশ্ন: অভিযোগগুলোর গুরুত্ব বিবেচনায় সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্য নেওয়ার চেষ্টা করা হলেও এডিজি (অপারেশন) মোহাম্মদ নাজমুল ইসলাম এবং চিফ কমার্শিয়াল ম্যানেজার সুজিত কুমার বিশ্বাস কোনো প্রতিক্রিয়া দেননি।কিছু প্রতিবেদনে এমন দাবি করা হয়েছে যে, “রেলওয়ের ডিজিকে বিতর্কিত করতে এসব করা হচ্ছে”—কিন্তু এই দাবির পক্ষে কোনো সুস্পষ্ট প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়নি। এতে প্রমাণভিত্তিক সাংবাদিকতা ও অনুমাননির্ভর প্রতিবেদনের মধ্যে সীমারেখা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।রাহাত এন্টারপ্রাইজের অভিযোগ: কাজ পেয়েও কার্যাদেশ থেকে বঞ্চিতপুরো বিতর্কে নতুন ও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মাত্রা যোগ করেছে রাহাত এন্টারপ্রাইজের অভিযোগ। প্রতিষ্ঠানটি দাবি করেছে, তারা অনবোর্ড সার্ভিস টেন্ডারে বৈধভাবে কাজ অর্জন করলেও বাস্তবে তাদের কার্যাদেশ (ওয়ার্ক অর্ডার) প্রদান করা হয়নি।গত ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে রেলওয়ের মহাপরিচালকের কাছে দেওয়া লিখিত অভিযোগে তারা উল্লেখ করে, সকল নিয়ম, শর্ত ও গাইডলাইন অনুসরণ করে তারা দরপত্রে অংশগ্রহণ করে এবং টেন্ডারে নির্বাচিত হয়। কিন্তু পরবর্তীতে অজ্ঞাত কারণে তাদের সেই কাজ কার্যকরভাবে প্রদান করা হয়নি।এই অভিযোগ বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ— এটি টেন্ডার সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় অনিয়মের সরাসরি ইঙ্গিত দেয়, নির্বাচিত দরদাতাকে প্রশাসনিকভাবে বঞ্চিত করার অভিযোগ তোলে,এবং টেন্ডার-পরবর্তী প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন সৃষ্টি করে।রাহাত এন্টারপ্রাইজের মতে, এই সিদ্ধান্ত শুধু অন্যায় নয়, বরং টেন্ডার নীতিমালার সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। তারা বিষয়টি পুনর্বিবেচনা এবং নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে তাদের প্রাপ্য কাজ বুঝিয়ে দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।নীরব প্রশাসন, বাড়ছে আস্থার সংকট: এতসব অভিযোগের প্রেক্ষিতে রেলওয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া না পাওয়া পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। যদিও রেলওয়ের মহাপরিচালক জানিয়েছেন, বিষয়টি তদন্ত করে দেখা হবে এবং সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে—এই তদন্ত কতটা নিরপেক্ষ, স্বচ্ছ এবং সময়োপযোগী হবে?রেলওয়ের ভাবমূর্তি ও জনআস্থার সংকট: অভিযোগগুলো এখনো চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত না হলেও, ধারাবাহিকভাবে এমন বিতর্ক প্রকাশ পাওয়ায় বাংলাদেশ রেলওয়ের প্রাতিষ্ঠানিক ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। যাচাইবিহীন তথ্য প্রকাশ, প্রশাসনিক নীরবতা এবং বিতর্কিত সিদ্ধান্ত—সব মিলিয়ে জনমনে আস্থাহীনতা তৈরি হচ্ছে।বিশেষজ্ঞদের মতামত: “সিস্টেমিক দুর্বলতার স্পষ্ট লক্ষণ” বিশেষজ্ঞদের মতে, অস্বাভাবিক কম দর, লভ্যাংশহীন প্রস্তাব, নির্বাচিত দরদাতাকে কাজ না দেওয়া এবং আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ—এই চারটি বিষয় একসঙ্গে উপস্থিত থাকলে তা একটি কাঠামোগত দুর্বলতার ইঙ্গিত দেয়।তারা সুপারিশ করেছেন- একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন, টেন্ডার প্রক্রিয়ার পূর্ণাঙ্গ ডিজিটালাইজেশন,BOQ ও মূল্যায়ন পদ্ধতির স্বচ্ছ প্রকাশ, এবং সংশ্লিষ্টদের জবাবদিহিতার আওতায় আনা।বাংলাদেশ রেলওয়ের অনবোর্ড টেন্ডার ঘিরে ওঠা এই অভিযোগগুলো কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়—বরং একটি বৃহত্তর প্রাতিষ্ঠানিক সংকটের প্রতিফলন। অস্বাভাবিক দরপ্রস্তাব, নির্বাচিত প্রতিষ্ঠানকে কার্যাদেশ না দেওয়া এবং ৪০ লাখ টাকার লেনদেনের অভিযোগ—সব মিলিয়ে পরিস্থিতি এখন গভীর ও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি রাখে।অভিযোগগুলো সত্য হোক বা মিথ্যা—দুই ক্ষেত্রেই একটি বিষয় স্পষ্ট: স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং প্রমাণভিত্তিক প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত ছাড়া এই সংকট থেকে উত্তরণ সম্ভব নয়। এখন দেখার বিষয়, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কত দ্রুত ও কার্যকরভাবে এই বিতর্কের সুরাহা করে এবং জনগণের আস্থা পুনরুদ্ধার করতে পারে।

রেলওয়ের অনবোর্ড টেন্ডার ঘিরে বিতর্ক তুঙ্গে