বাংলাদেশ রেলওয়েতে গত চার বছরে চারজন মহাপরিচালক পরিবর্তন হলেও অদৃশ্য কারণে এখনো সংশোধন হয়নি রেলওয়ে ক্যাডার বহির্ভূত কর্মচারী নিয়োগ বিধিমালা–২০২০। দীর্ঘ এই অনিশ্চয়তা ও গোপনীয়তা রেলওয়ের নিয়োগ ব্যবস্থাকে এক গভীর প্রশাসনিক ও আইনি সংকটের দিকে ঠেলে দিয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
বাংলাদেশ রেলওয়ে পোষ্য সোসাইটির সভাপতি মো. মনিরুজ্জামান মনির এই পরিস্থিতিতে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, নিয়োগ বিধিমালা সংশোধন ইচ্ছাকৃতভাবে ঝুলিয়ে রেখে অবৈধ ও প্রশ্নবিদ্ধ নিয়োগকে বৈধতা দেওয়ার পথ তৈরি করা হচ্ছে।
বর্তমান মহাপরিচালক মো. আফজাল হোসেন দায়িত্ব গ্রহণের প্রায় এক বছর পার করলেও তার মেয়াদে নিয়োগ বিধিমালা–২০২০ সংশোধন ও অনুমোদন আদৌ সম্ভব হবে কি না—তা নিয়েও সংশয় প্রকাশ করেছেন তিনি।
আন্দোলনের মুখে কমিটি, চার বছরেও ফল নেইঃ
নিয়োগ বিধিমালা–২০২০ নীতিগতভাবে প্রত্যাখ্যান করে রেলওয়ের সকল ট্রেড ইউনিয়ন ও বাংলাদেশ রেলওয়ে পোষ্য সোসাইটির আন্দোলন-সংগ্রামের মুখে ২০২১ সালের ২৭ ডিসেম্বর মহাপরিচালককে আহ্বায়ক করে ১৮ সদস্যবিশিষ্ট একটি কমিটি গঠন করা হয়। কমিটির দায়িত্ব ছিল বিধিমালা হালনাগাদ ও সংশোধন করা।
কিন্তু চার বছর পার হলেও কমিটি কোনো সংশোধন চূড়ান্ত করতে পারেনি। অভিযোগ রয়েছে, সংশোধন ছাড়াই তথাকথিত ‘গায়েবী বিধিমালা’র ভিত্তিতে অবৈধভাবে জনবল নিয়োগ কার্যক্রম চালু রাখা হয়েছে। এমনকি কমিটির সদস্যরা কখনো একসঙ্গে বসে সংশোধন নিয়ে আলোচনা করেছেন কি না—তা নিয়েও সংশয় রয়েছে।
চার মহাপরিচালক, একই পরিণতিঃ
এই সময়ে মো. শামসুজ্জামান, ডিএন মজুমদার ও মো. কামরুল আহসান তাদের মেয়াদকালে নিয়োগ বিধিমালা সংশোধনে ব্যর্থ হন। সর্বশেষ মহাপরিচালক সরদার সাহাদাত আলী সংশোধন করলেও অদৃশ্য কারণে তা অনুমোদন করাতে পারেননি।
বর্তমান মহাপরিচালক আফজাল হোসেন দায়িত্ব গ্রহণের এক বছর পূর্ণ করলেও এখনো সংশোধন ও অনুমোদনের কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই। এতে প্রভাবশালী দুর্নীতিবাজ চক্রের প্রভাব নিয়ে প্রশ্ন জোরালো হচ্ছে।
৬ হাজার নিয়োগ, দক্ষতা সংকটঃ
পোষ্য সোসাইটির দাবি অনুযায়ী, নিয়োগ বিধিমালা সংশোধন ঝুলিয়ে রেখে গত চার বছরে প্রায় ৬ হাজার জনবল নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৬০ শতাংশ জনবল চাকরি ছেড়ে দিয়েছেন। ফলে ট্রেন পরিচালনা, রক্ষণাবেক্ষণ, সিগন্যাল ব্যবস্থা, কোচের যান্ত্রিক ও বৈদ্যুতিক কাজসহ রেলওয়ের সকল বিভাগে দক্ষ জনবলের মারাত্মক সংকট তৈরি হয়েছে।
মো. মনিরুজ্জামান মনির বলেন, বাংলাদেশ রেলওয়ে একটি বিশেষায়িত কারিগরি পরিবহন সংস্থা। এখানে সাধারণ প্রশাসনিক কাঠামো প্রয়োগ করলে রেলওয়ের অস্তিত্বই ঝুঁকিতে পড়বে।
পোষ্যদের অধিকার বঞ্চনা ও ‘শুভঙ্করের ফাঁকি’ঃ
নিয়োগ বিধিমালা–২০২০ এর মাধ্যমে চাকরি পাওয়ার আগেই অর্ধেক প্রশিক্ষিত রেলওয়ে শ্রমিক-কর্মচারীর সন্তানদের কৌশলে চাকরির অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ করা হয়।
নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে যুক্ত শর্ত—
“নিয়োগের ক্ষেত্রে সরকারের বিদ্যমান বিধি-বিধান ও পরবর্তীতে সংশোধিত বিধি-বিধান অনুসরণযোগ্য হবে”—কে তিনি ‘শুভঙ্করের ফাঁকি’ হিসেবে উল্লেখ করেন। তার মতে, ভবিষ্যতে বিধিমালা সংশোধন হলেও বর্তমানে বঞ্চিতদের জন্য আর আবেদন করার সুযোগ বাস্তবে থাকবে না।
নির্বাচন সামনে, নিয়োগ পরীক্ষা নিয়ে রহস্যঃ
জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে, নিয়োগ বিধিমালা সংশোধন প্রক্রিয়া ও হাইকোর্টের রুল বিচারাধীন থাকা সত্ত্বেও জানুয়ারিতে একাধিক নিয়োগ পরীক্ষা নেওয়ার সিদ্ধান্ত নতুন করে বিতর্ক তৈরি করেছে।
মো. মনিরুজ্জামান মনির বলেন, “যেখানে নিয়োগ বিধিমালার বৈধতা বিচারাধীন এবং জাতীয় নির্বাচন সামনে, সেখানে এই তাড়াহুড়া প্রক্রিয়াগতভাবে অগ্রহণযোগ্য এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলেই মনে হচ্ছে।”
তিনি দাবি করেন, নির্বাচনকালীন ব্যস্ততা ও নজরদারির ঘাটতিকে কাজে লাগিয়ে নিয়োগ প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া হলে তা বড় আইনি সংকট ও জনআস্থার মারাত্মক ক্ষতি ডেকে আনবে
চার বছর ধরে নিয়োগ বিধিমালা সংশোধন না করে নিয়োগ কার্যক্রম চালু রাখা এবং নির্বাচন সামনে রেখে নিয়োগ পরীক্ষা আয়োজন—এই দুই বিষয় মিলিয়ে বাংলাদেশ রেলওয়ে এখন গভীর প্রশাসনিক, আইনি ও নৈতিক সংকটের মুখোমুখি। প্রশ্ন উঠছে—নিয়োগ বিধিমালা কি আদৌ আলোর মুখ দেখবে, নাকি রেলওয়ের নিয়োগ ব্যবস্থা দীর্ঘদিন ধরেই অন্ধকারেই রয়ে যাবে?

বৃহস্পতিবার, ১৫ জানুয়ারি ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৪ জানুয়ারি ২০২৬
বাংলাদেশ রেলওয়েতে গত চার বছরে চারজন মহাপরিচালক পরিবর্তন হলেও অদৃশ্য কারণে এখনো সংশোধন হয়নি রেলওয়ে ক্যাডার বহির্ভূত কর্মচারী নিয়োগ বিধিমালা–২০২০। দীর্ঘ এই অনিশ্চয়তা ও গোপনীয়তা রেলওয়ের নিয়োগ ব্যবস্থাকে এক গভীর প্রশাসনিক ও আইনি সংকটের দিকে ঠেলে দিয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
বাংলাদেশ রেলওয়ে পোষ্য সোসাইটির সভাপতি মো. মনিরুজ্জামান মনির এই পরিস্থিতিতে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, নিয়োগ বিধিমালা সংশোধন ইচ্ছাকৃতভাবে ঝুলিয়ে রেখে অবৈধ ও প্রশ্নবিদ্ধ নিয়োগকে বৈধতা দেওয়ার পথ তৈরি করা হচ্ছে।
বর্তমান মহাপরিচালক মো. আফজাল হোসেন দায়িত্ব গ্রহণের প্রায় এক বছর পার করলেও তার মেয়াদে নিয়োগ বিধিমালা–২০২০ সংশোধন ও অনুমোদন আদৌ সম্ভব হবে কি না—তা নিয়েও সংশয় প্রকাশ করেছেন তিনি।
আন্দোলনের মুখে কমিটি, চার বছরেও ফল নেইঃ
নিয়োগ বিধিমালা–২০২০ নীতিগতভাবে প্রত্যাখ্যান করে রেলওয়ের সকল ট্রেড ইউনিয়ন ও বাংলাদেশ রেলওয়ে পোষ্য সোসাইটির আন্দোলন-সংগ্রামের মুখে ২০২১ সালের ২৭ ডিসেম্বর মহাপরিচালককে আহ্বায়ক করে ১৮ সদস্যবিশিষ্ট একটি কমিটি গঠন করা হয়। কমিটির দায়িত্ব ছিল বিধিমালা হালনাগাদ ও সংশোধন করা।
কিন্তু চার বছর পার হলেও কমিটি কোনো সংশোধন চূড়ান্ত করতে পারেনি। অভিযোগ রয়েছে, সংশোধন ছাড়াই তথাকথিত ‘গায়েবী বিধিমালা’র ভিত্তিতে অবৈধভাবে জনবল নিয়োগ কার্যক্রম চালু রাখা হয়েছে। এমনকি কমিটির সদস্যরা কখনো একসঙ্গে বসে সংশোধন নিয়ে আলোচনা করেছেন কি না—তা নিয়েও সংশয় রয়েছে।
চার মহাপরিচালক, একই পরিণতিঃ
এই সময়ে মো. শামসুজ্জামান, ডিএন মজুমদার ও মো. কামরুল আহসান তাদের মেয়াদকালে নিয়োগ বিধিমালা সংশোধনে ব্যর্থ হন। সর্বশেষ মহাপরিচালক সরদার সাহাদাত আলী সংশোধন করলেও অদৃশ্য কারণে তা অনুমোদন করাতে পারেননি।
বর্তমান মহাপরিচালক আফজাল হোসেন দায়িত্ব গ্রহণের এক বছর পূর্ণ করলেও এখনো সংশোধন ও অনুমোদনের কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই। এতে প্রভাবশালী দুর্নীতিবাজ চক্রের প্রভাব নিয়ে প্রশ্ন জোরালো হচ্ছে।
৬ হাজার নিয়োগ, দক্ষতা সংকটঃ
পোষ্য সোসাইটির দাবি অনুযায়ী, নিয়োগ বিধিমালা সংশোধন ঝুলিয়ে রেখে গত চার বছরে প্রায় ৬ হাজার জনবল নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৬০ শতাংশ জনবল চাকরি ছেড়ে দিয়েছেন। ফলে ট্রেন পরিচালনা, রক্ষণাবেক্ষণ, সিগন্যাল ব্যবস্থা, কোচের যান্ত্রিক ও বৈদ্যুতিক কাজসহ রেলওয়ের সকল বিভাগে দক্ষ জনবলের মারাত্মক সংকট তৈরি হয়েছে।
মো. মনিরুজ্জামান মনির বলেন, বাংলাদেশ রেলওয়ে একটি বিশেষায়িত কারিগরি পরিবহন সংস্থা। এখানে সাধারণ প্রশাসনিক কাঠামো প্রয়োগ করলে রেলওয়ের অস্তিত্বই ঝুঁকিতে পড়বে।
পোষ্যদের অধিকার বঞ্চনা ও ‘শুভঙ্করের ফাঁকি’ঃ
নিয়োগ বিধিমালা–২০২০ এর মাধ্যমে চাকরি পাওয়ার আগেই অর্ধেক প্রশিক্ষিত রেলওয়ে শ্রমিক-কর্মচারীর সন্তানদের কৌশলে চাকরির অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ করা হয়।
নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে যুক্ত শর্ত—
“নিয়োগের ক্ষেত্রে সরকারের বিদ্যমান বিধি-বিধান ও পরবর্তীতে সংশোধিত বিধি-বিধান অনুসরণযোগ্য হবে”—কে তিনি ‘শুভঙ্করের ফাঁকি’ হিসেবে উল্লেখ করেন। তার মতে, ভবিষ্যতে বিধিমালা সংশোধন হলেও বর্তমানে বঞ্চিতদের জন্য আর আবেদন করার সুযোগ বাস্তবে থাকবে না।
নির্বাচন সামনে, নিয়োগ পরীক্ষা নিয়ে রহস্যঃ
জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে, নিয়োগ বিধিমালা সংশোধন প্রক্রিয়া ও হাইকোর্টের রুল বিচারাধীন থাকা সত্ত্বেও জানুয়ারিতে একাধিক নিয়োগ পরীক্ষা নেওয়ার সিদ্ধান্ত নতুন করে বিতর্ক তৈরি করেছে।
মো. মনিরুজ্জামান মনির বলেন, “যেখানে নিয়োগ বিধিমালার বৈধতা বিচারাধীন এবং জাতীয় নির্বাচন সামনে, সেখানে এই তাড়াহুড়া প্রক্রিয়াগতভাবে অগ্রহণযোগ্য এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলেই মনে হচ্ছে।”
তিনি দাবি করেন, নির্বাচনকালীন ব্যস্ততা ও নজরদারির ঘাটতিকে কাজে লাগিয়ে নিয়োগ প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া হলে তা বড় আইনি সংকট ও জনআস্থার মারাত্মক ক্ষতি ডেকে আনবে
চার বছর ধরে নিয়োগ বিধিমালা সংশোধন না করে নিয়োগ কার্যক্রম চালু রাখা এবং নির্বাচন সামনে রেখে নিয়োগ পরীক্ষা আয়োজন—এই দুই বিষয় মিলিয়ে বাংলাদেশ রেলওয়ে এখন গভীর প্রশাসনিক, আইনি ও নৈতিক সংকটের মুখোমুখি। প্রশ্ন উঠছে—নিয়োগ বিধিমালা কি আদৌ আলোর মুখ দেখবে, নাকি রেলওয়ের নিয়োগ ব্যবস্থা দীর্ঘদিন ধরেই অন্ধকারেই রয়ে যাবে?

আপনার মতামত লিখুন