ঢাকা   মঙ্গলবার, ১২ মে ২০২৬
দৈনিক রেলওয়ে বার্তা

রেলওয়ের পতনের নেপথ্যে রেলওয়েই: একটি পরিবারের আত্মবিধ্বংসের নির্মম ইতিহাস



রেলওয়ের পতনের নেপথ্যে রেলওয়েই: একটি পরিবারের আত্মবিধ্বংসের নির্মম ইতিহাস

বাংলাদেশ রেলওয়ে—এটি শুধু একটি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান নয়; এটি একটি ঐতিহ্য, একটি আবেগ, একটি বৃহৎ পরিবার। যুগের পর যুগ এই প্রতিষ্ঠান দেশের অর্থনীতি, যোগাযোগ ব্যবস্থা ও মানুষের জীবনের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে। কিন্তু অত্যন্ত বেদনাদায়ক বাস্তবতা হলো, আজ সেই ঐতিহ্যবাহী পরিবার ধীরে ধীরে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গেছে।

একটি পরিবার কখন দুর্বল হয়ে পড়ে? যখন পরিবারের সদস্যরাই নিজেদের স্বার্থকে পরিবারের স্বার্থের ঊর্ধ্বে স্থান দেয়। যখন অভ্যন্তরীণ মতবিরোধ সমাধানের পরিবর্তে বাইরের শক্তির প্ররোচনায় সংঘাত, বিভাজন ও অস্থিরতা সৃষ্টি করা হয়। যখন পরিবারে পারস্পরিক বিশ্বাস হারিয়ে যায় এবং নোংরা প্রতিযোগিতা, তোষণনীতি ও স্বার্থকেন্দ্রিক গোষ্ঠীবাদ প্রতিষ্ঠা পায়—তখন সেই পরিবারের অভ্যন্তরীণ স্বাধীনতা ধীরে ধীরে অন্যদের হস্তক্ষেপের সুযোগ তৈরি করে।

প্রথমে সেই হস্তক্ষেপ সাময়িক মনে হয়। পরে তা স্থায়ী রূপ নেয়। একসময় পরিবার নিজের সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতাই হারিয়ে ফেলে। অভিভাবকরাও হয়ে পড়ে অস্থির, দুর্বল ও পরনির্ভরশীল। আর সেই সুযোগে বাইরের শক্তিগুলো পরিবারটির উপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে।

আজ বাংলাদেশের রেলওয়ের বাস্তবতাও যেন ঠিক তেমনই।

দীর্ঘদিনের অভ্যন্তরীণ বিভক্তি, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পারস্পরিক অবিশ্বাস, স্বার্থভিত্তিক গ্রুপিং, অযোগ্য তোষণনীতি এবং নীতিহীন আনুগত্যের সংস্কৃতি বাংলাদেশ রেলওয়েকে এমন এক সংকটে নিয়ে গেছে, যেখানে প্রতিষ্ঠানটির নিজস্ব প্রশাসনিক সক্ষমতা ও মর্যাদা ক্রমেই ক্ষয়ে যাচ্ছে।

সবচেয়ে ভয়াবহ বাস্তবতা হলো—আজ বাংলাদেশ রেলওয়ে কার্যত নিজস্ব সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা হারানোর পথে। নিয়োগ, পদোন্নতি, প্রশাসনিক কাঠামো, জনবল ব্যবস্থাপনা কিংবা গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত সিদ্ধান্ত—সব ক্ষেত্রেই বহিরাগত নিয়ন্ত্রণের প্রভাব বাড়ছে। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়, পিএসসি এবং রেলপথ মন্ত্রণালয়ের উপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা এমন অবস্থায় পৌঁছেছে যে, রেলওয়ে যেন নিজের অস্তিত্বের সিদ্ধান্তও নিজে নিতে পারছে না।

কিন্তু প্রশ্ন হলো—এই পরিস্থিতির জন্য দায়ী কে?

কঠিন হলেও সত্য, এর জন্য সবচেয়ে বেশি দায়ী রেলওয়ের অভ্যন্তরীণ দুর্বলতা। কারণ ইতিহাস বলে, কোনো প্রতিষ্ঠান বাইরের আঘাতে যতটা ধ্বংস হয়নি, তার চেয়ে বেশি ধ্বংস হয়েছে অভ্যন্তরীণ বিভক্তি, অবিশ্বাস ও আত্মঘাতী নীরবতায়।

যখন প্রতিষ্ঠানের মানুষ নিজের প্রতিষ্ঠানকে ভালোবাসার পরিবর্তে ব্যক্তি স্বার্থে বিভক্ত হয়ে পড়ে, তখন বাইরের শক্তি সেই দুর্বলতার সুযোগ নেবেই। যখন কর্মকর্তা-কর্মচারীরা নিজেদের অধিকার, মর্যাদা ও পেশাদারিত্বের প্রশ্নে ঐক্যবদ্ধ না থেকে রাজনৈতিক আনুগত্য, ব্যক্তিগত সুবিধা ও গ্রুপিংয়ে ব্যস্ত থাকে—তখন প্রতিষ্ঠান ধীরে ধীরে জিম্মি হয়ে পড়ে।

আজ প্রয়োজন দোষারোপ নয়; প্রয়োজন আত্মসমালোচনা।

প্রয়োজন “রেলওয়ে পরিবার” ধারণাকে পুনর্জাগরিত করা। কর্মকর্তা, কর্মচারী, শ্রমিক, পোষ্যসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে বুঝতে হবে—রেলওয়ে দুর্বল হলে কেউ শক্তিশালী থাকবে না। পরিবার ভেঙে গেলে শেষ পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত হয় পরিবারের প্রতিটি সদস্যই।

বাংলাদেশ রেলওয়েকে বাঁচাতে হলে এখনই ঐক্য, জবাবদিহিতা, পেশাদারিত্ব ও আত্মমর্যাদাবোধ ফিরিয়ে আনতে হবে। অন্যথায় ইতিহাস একদিন নির্মমভাবে লিখবে—

“বাংলাদেশ রেলওয়ে বাইরের ষড়যন্ত্রে নয়, নিজেদের অভ্যন্তরীণ বিভক্তি ও আত্মঘাতী স্বার্থের কারণেই ধ্বংস হয়েছিল।”

লেখকঃ সাংবাদিক ও কলামিস্ট এবং সভাপতি বাংলাদেশ রেলওয়ে পোষ্য সোসাইটি

আপনার মতামত লিখুন

দৈনিক রেলওয়ে বার্তা

মঙ্গলবার, ১২ মে ২০২৬


রেলওয়ের পতনের নেপথ্যে রেলওয়েই: একটি পরিবারের আত্মবিধ্বংসের নির্মম ইতিহাস

প্রকাশের তারিখ : ১২ মে ২০২৬

featured Image

বাংলাদেশ রেলওয়ে—এটি শুধু একটি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান নয়; এটি একটি ঐতিহ্য, একটি আবেগ, একটি বৃহৎ পরিবার। যুগের পর যুগ এই প্রতিষ্ঠান দেশের অর্থনীতি, যোগাযোগ ব্যবস্থা ও মানুষের জীবনের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে। কিন্তু অত্যন্ত বেদনাদায়ক বাস্তবতা হলো, আজ সেই ঐতিহ্যবাহী পরিবার ধীরে ধীরে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গেছে।

একটি পরিবার কখন দুর্বল হয়ে পড়ে? যখন পরিবারের সদস্যরাই নিজেদের স্বার্থকে পরিবারের স্বার্থের ঊর্ধ্বে স্থান দেয়। যখন অভ্যন্তরীণ মতবিরোধ সমাধানের পরিবর্তে বাইরের শক্তির প্ররোচনায় সংঘাত, বিভাজন ও অস্থিরতা সৃষ্টি করা হয়। যখন পরিবারে পারস্পরিক বিশ্বাস হারিয়ে যায় এবং নোংরা প্রতিযোগিতা, তোষণনীতি ও স্বার্থকেন্দ্রিক গোষ্ঠীবাদ প্রতিষ্ঠা পায়—তখন সেই পরিবারের অভ্যন্তরীণ স্বাধীনতা ধীরে ধীরে অন্যদের হস্তক্ষেপের সুযোগ তৈরি করে।

প্রথমে সেই হস্তক্ষেপ সাময়িক মনে হয়। পরে তা স্থায়ী রূপ নেয়। একসময় পরিবার নিজের সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতাই হারিয়ে ফেলে। অভিভাবকরাও হয়ে পড়ে অস্থির, দুর্বল ও পরনির্ভরশীল। আর সেই সুযোগে বাইরের শক্তিগুলো পরিবারটির উপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে।

আজ বাংলাদেশের রেলওয়ের বাস্তবতাও যেন ঠিক তেমনই।

দীর্ঘদিনের অভ্যন্তরীণ বিভক্তি, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পারস্পরিক অবিশ্বাস, স্বার্থভিত্তিক গ্রুপিং, অযোগ্য তোষণনীতি এবং নীতিহীন আনুগত্যের সংস্কৃতি বাংলাদেশ রেলওয়েকে এমন এক সংকটে নিয়ে গেছে, যেখানে প্রতিষ্ঠানটির নিজস্ব প্রশাসনিক সক্ষমতা ও মর্যাদা ক্রমেই ক্ষয়ে যাচ্ছে।

সবচেয়ে ভয়াবহ বাস্তবতা হলো—আজ বাংলাদেশ রেলওয়ে কার্যত নিজস্ব সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা হারানোর পথে। নিয়োগ, পদোন্নতি, প্রশাসনিক কাঠামো, জনবল ব্যবস্থাপনা কিংবা গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত সিদ্ধান্ত—সব ক্ষেত্রেই বহিরাগত নিয়ন্ত্রণের প্রভাব বাড়ছে। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়, পিএসসি এবং রেলপথ মন্ত্রণালয়ের উপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা এমন অবস্থায় পৌঁছেছে যে, রেলওয়ে যেন নিজের অস্তিত্বের সিদ্ধান্তও নিজে নিতে পারছে না।

কিন্তু প্রশ্ন হলো—এই পরিস্থিতির জন্য দায়ী কে?

কঠিন হলেও সত্য, এর জন্য সবচেয়ে বেশি দায়ী রেলওয়ের অভ্যন্তরীণ দুর্বলতা। কারণ ইতিহাস বলে, কোনো প্রতিষ্ঠান বাইরের আঘাতে যতটা ধ্বংস হয়নি, তার চেয়ে বেশি ধ্বংস হয়েছে অভ্যন্তরীণ বিভক্তি, অবিশ্বাস ও আত্মঘাতী নীরবতায়।

যখন প্রতিষ্ঠানের মানুষ নিজের প্রতিষ্ঠানকে ভালোবাসার পরিবর্তে ব্যক্তি স্বার্থে বিভক্ত হয়ে পড়ে, তখন বাইরের শক্তি সেই দুর্বলতার সুযোগ নেবেই। যখন কর্মকর্তা-কর্মচারীরা নিজেদের অধিকার, মর্যাদা ও পেশাদারিত্বের প্রশ্নে ঐক্যবদ্ধ না থেকে রাজনৈতিক আনুগত্য, ব্যক্তিগত সুবিধা ও গ্রুপিংয়ে ব্যস্ত থাকে—তখন প্রতিষ্ঠান ধীরে ধীরে জিম্মি হয়ে পড়ে।

আজ প্রয়োজন দোষারোপ নয়; প্রয়োজন আত্মসমালোচনা।

প্রয়োজন “রেলওয়ে পরিবার” ধারণাকে পুনর্জাগরিত করা। কর্মকর্তা, কর্মচারী, শ্রমিক, পোষ্যসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে বুঝতে হবে—রেলওয়ে দুর্বল হলে কেউ শক্তিশালী থাকবে না। পরিবার ভেঙে গেলে শেষ পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত হয় পরিবারের প্রতিটি সদস্যই।

বাংলাদেশ রেলওয়েকে বাঁচাতে হলে এখনই ঐক্য, জবাবদিহিতা, পেশাদারিত্ব ও আত্মমর্যাদাবোধ ফিরিয়ে আনতে হবে। অন্যথায় ইতিহাস একদিন নির্মমভাবে লিখবে—

“বাংলাদেশ রেলওয়ে বাইরের ষড়যন্ত্রে নয়, নিজেদের অভ্যন্তরীণ বিভক্তি ও আত্মঘাতী স্বার্থের কারণেই ধ্বংস হয়েছিল।”

লেখকঃ সাংবাদিক ও কলামিস্ট এবং সভাপতি বাংলাদেশ রেলওয়ে পোষ্য সোসাইটি


দৈনিক রেলওয়ে বার্তা

সম্পাদক ও প্রকাশকঃ মো: মনিরুজ্জামান (মনির) 

কপিরাইট © ২০২৬ দৈনিক রেলওয়ে বার্তা । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত