ঢাকা   শনিবার, ০৩ অক্টোবর ২০২৬
দৈনিক রেলওয়ে বার্তা

ব্যবস্থাপনাই যখন লাইনচ্যুত, উদ্ধারকারী ট্রেন তো লাইনচ্যুত হবেই!


প্রকাশ : ০৩ অক্টোবর ২০২৬ | প্রিন্ট সংস্করণ | ফটো কার্ড

ব্যবস্থাপনাই যখন লাইনচ্যুত, উদ্ধারকারী ট্রেন তো লাইনচ্যুত হবেই!

 

"মনিরুজ্জামান মনির"

সাংবাদিক ও কলামিস্ট

 ট্রেন লাইনচ্যুত হলে সেটি উদ্ধারের দায়িত্ব যে ট্রেনের, সেই উদ্ধারকারী ট্রেনই যদি লাইনচ্যুত হয়—তখন বিষয়টি আর নিছক একটি দুর্ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ থাকে না। প্রশ্ন ওঠে পুরো ব্যবস্থাপনা কাঠামো নিয়ে। কারণ উদ্ধারকারী ব্যবস্থাই যদি ঝুঁকির বাইরে না থাকে, তাহলে দুর্ঘটনার পর দ্রুত ও নিরাপদ উদ্ধার কার্যক্রম কতটা নিশ্চিত?

 বাংলাদেশ রেলওয়েতে সাম্প্রতিক একের পর এক লাইনচ্যুতির ঘটনায় এমন প্রশ্নই ক্রমশ সামনে আসছে।

 সর্বশেষ ২ অক্টোবর ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়া রেলওয়ে স্টেশনের ইয়ার্ডের কাছে সিলেটের উদ্দেশে যাত্রার সময় একটি উদ্ধারকারী ট্রেনের ট্রলির চারটি চাকা লাইনচ্যুত হয়। এতে ঢাকা–চট্টগ্রাম রেলপথের ডাউন লাইনে ট্রেন চলাচল বন্ধ হয়ে যায় এবং রেলওয়ের এক কর্মী আহত হন। প্রায় দুই ঘণ্টা পর লাইনচ্যুত ট্রলিটি উদ্ধার করে যোগাযোগ স্বাভাবিক করা হয়। ঘটনাটি তদন্তে ঢাকা রেলওয়ে বিভাগ তিন সদস্যের কমিটি গঠন করেছে।

 ঘটনার সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিক হলো—যে ট্রেনের কাজ অন্য ট্রেনের দুর্ঘটনা মোকাবিলা করা, সেই উদ্ধারকারী ট্রেনই দুর্ঘটনার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এখানেই রেলওয়ের ব্যবস্থাপনার সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি দাঁড়ায়।

 উদ্ধারকারী ট্রেনেরই যদি নিরাপত্তা নিশ্চিত না থাকেঃ একটি রেলওয়ের নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা শুধু যাত্রীবাহী ট্রেন নিরাপদে চালানোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। ট্র্যাক, পয়েন্ট, সিগন্যাল, ইয়ার্ড, রোলিং স্টক, লোকোমোটিভ, ওয়াগন, উদ্ধারকারী সরঞ্জাম—সবকিছুই একই নিরাপত্তা ব্যবস্থার অংশ।

 বিশেষ করে উদ্ধারকারী ট্রেনের ক্ষেত্রে নিয়মিত কারিগরি পরীক্ষা আরও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ দুর্ঘটনা ঘটলে সময়ের বিরুদ্ধে লড়াই করেই সেটিকে ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে হয়।

 সেই উদ্ধারকারী ট্রেনের ট্রলির চারটি চাকা একসঙ্গে লাইনচ্যুত হওয়ার ঘটনা তাই স্বাভাবিকভাবেই জানতে চায়— ট্রলিটির সর্বশেষ কারিগরি পরীক্ষা কবে হয়েছিল? চাকা ও হুইল-সেটের অবস্থা কী ছিল? যাত্রার আগে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা পরীক্ষা সম্পন্ন হয়েছিল কি না?

ইয়ার্ডের সংশ্লিষ্ট লাইন ও পয়েন্ট ব্যবস্থার সর্বশেষ পরিদর্শন কবে হয়েছিল?

 এগুলো তদন্তের বিষয়। তদন্ত শেষ হওয়ার আগে কোনো একটি কারণকে দায়ী করা সমীচীন নয়। কিন্তু প্রশ্নগুলো এড়িয়ে যাওয়ারও সুযোগ নেই।

 একই এলাকায় পরপর ঘটনা কেন? আখাউড়ার ঘটনাটি আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে, কারণ এর মাত্র কয়েক দিন আগে ৩০ সেপ্টেম্বর রাতে আখাউড়ায় একটি তেলবাহী ওয়াগন ট্রেনের চাকা লাইনচ্যুত হয়েছিল। ওই ঘটনার পর দুর্ঘটনাকবলিত ট্রেন উদ্ধারে রেলওয়ের উদ্ধারকারী দল কাজ শুরু করে। তারপর ২ অক্টোবর সেই উদ্ধারকারী ট্রেনেরই ট্রলি লাইনচ্যুত হলো।

 দুটি ঘটনার কারণ একই—এমন কোনো সিদ্ধান্ত দেওয়ার সুযোগ নেই। তবে একই জংশন ও ইয়ার্ড এলাকায় অল্প সময়ের ব্যবধানে একাধিক লাইনচ্যুতির ঘটনা ঘটলে সংশ্লিষ্ট অবকাঠামো ও অপারেশনাল ব্যবস্থাপনা নিয়ে সামগ্রিক পর্যালোচনার প্রয়োজনীয়তা অবশ্যই তৈরি হয়।

 দুর্ঘটনা বাড়ছে, নাকি বাড়ছে ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা? সাম্প্রতিক সময়েও দেশের বিভিন্ন রেলপথে লাইনচ্যুতির ঘটনা ঘটেছে। সেপ্টেম্বরে গফরগাঁওয়ে একটি মালবাহী ট্রেনের বগি লাইনচ্যুত হয়ে ঢাকা–ময়মনসিংহ রুটে ট্রেন চলাচল বন্ধ হয়েছিল; সেখানে রিলিফ ট্রেন দিয়ে উদ্ধারকাজ করার কথা জানানো হয়েছিল।

 একটি দুর্ঘটনার পর আরেকটি দুর্ঘটনা ঘটতেই পারে। যান্ত্রিক ত্রুটি, অবকাঠামোগত সমস্যা, মানবিক ভুল, অতিরিক্ত গতি, পয়েন্ট বা ট্র্যাকের ত্রুটি কিংবা অন্য কোনো কারণ—তদন্ত ছাড়া কোনটি দায়ী তা বলা যায় না। কিন্তু বারবার দুর্ঘটনা ঘটলে শুধু দুর্ঘটনার কারণ খোঁজা যথেষ্ট নয়; দুর্ঘটনা প্রতিরোধের ব্যবস্থাপনাটিও পরীক্ষা করা প্রয়োজন।

 তদন্ত কমিটি নয়, চাই তদন্তের ফলাফলঃ রেলওয়েতে দুর্ঘটনার পর তদন্ত কমিটি গঠন নতুন কিছু নয়। আখাউড়ার সর্বশেষ ঘটনাতেও তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি করা হয়েছে।

কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে—তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশের পর সুপারিশগুলো কতটা বাস্তবায়ন হয়?

 একটি দুর্ঘটনার তদন্ত যদি শুধু তাৎক্ষণিক কারণ চিহ্নিত করে শেষ হয়ে যায়, কিন্তু একই ধরনের ঝুঁকি থেকে যায়, তাহলে সেই তদন্তের মূল উদ্দেশ্য পূরণ হয় না।

 প্রতিটি লাইনচ্যুতির পর তাই শুধু ‘কে ভুল করেছে’—এই প্রশ্ন নয়; বরং জানতে হবে—

ঝুঁকিটি আগে শনাক্ত হয়েছিল কি না; নিয়মিত পরিদর্শন হয়েছিল কি না; পূর্ববর্তী কোনো ত্রুটি বা সতর্কবার্তা ছিল কি না; রক্ষণাবেক্ষণ যথাসময়ে করা হয়েছিল কি না; দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জবাবদিহি কী; পূর্ববর্তী তদন্তের সুপারিশ বাস্তবায়িত হয়েছিল কি না।

 রেলওয়ের প্রয়োজন প্রতিক্রিয়াশীল নয়, প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থাপনা

দুর্ঘটনার পর উদ্ধারকারী ট্রেন পাঠানো জরুরি। কিন্তু একটি কার্যকর রেলওয়ে ব্যবস্থাপনার সাফল্য মাপা উচিত শুধু দুর্ঘটনার পর কত দ্রুত উদ্ধার করা হলো তা দিয়ে নয়—দুর্ঘটনা ঘটার আগেই কতটা ঝুঁকি শনাক্ত ও প্রতিরোধ করা গেল, সেটি দিয়েও।

 কারণ রেলপথে একটি লাইনচ্যুতি শুধু একটি ট্রেনের সমস্যা নয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয় শত শত যাত্রীর সময়, নিরাপত্তা, আর্থিক ক্ষতি এবং পুরো রেল নেটওয়ার্কের পরিচালনাগত চাপ।

আর উদ্ধারকারী ট্রেনই যদি লাইনচ্যুত হয়, তাহলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে পড়ে।

প্রশ্নটি তাই ব্যবস্থাপনাকে ঘিরেইঃ রেলওয়ের অবকাঠামো যত আধুনিকই হোক, ব্যবস্থাপনা দুর্বল হলে নিরাপত্তা ব্যবস্থা টেকসই হয় না। নতুন প্রকল্প, নতুন কোচ, নতুন লোকোমোটিভ কিংবা আধুনিক প্রযুক্তির পাশাপাশি প্রয়োজন দক্ষ রক্ষণাবেক্ষণ, নিয়মিত কারিগরি পরীক্ষা, কার্যকর নজরদারি, দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং সর্বোপরি জবাবদিহি।

 আখাউড়ার ঘটনা তাই শুধু একটি উদ্ধারকারী ট্রেনের চার চাকা লাইনচ্যুত হওয়ার ঘটনা নয়। এটি রেলওয়ের নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনার সক্ষমতা যাচাইয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপলক্ষ। কারণ যে ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব লাইনচ্যুত ট্রেনকে নিরাপদে উদ্ধার করা, সেই ব্যবস্থাপনাই যদি নিজের উদ্ধারযানকে নিরাপদ রাখতে ব্যর্থ হয়, তাহলে প্রশ্ন উঠবেই—

রেলওয়ের সমস্যা কি শুধু লাইনে, নাকি ব্যবস্থাপনার ভেতরেও কোথাও লাইনচ্যুতি ঘটেছে?

আপনার মতামত লিখুন

দৈনিক রেলওয়ে বার্তা

শনিবার, ০৩ অক্টোবর ২০২৬


ব্যবস্থাপনাই যখন লাইনচ্যুত, উদ্ধারকারী ট্রেন তো লাইনচ্যুত হবেই!

প্রকাশের তারিখ : ০৩ অক্টোবর ২০২৬

featured Image

 

"মনিরুজ্জামান মনির"

সাংবাদিক ও কলামিস্ট

 ট্রেন লাইনচ্যুত হলে সেটি উদ্ধারের দায়িত্ব যে ট্রেনের, সেই উদ্ধারকারী ট্রেনই যদি লাইনচ্যুত হয়—তখন বিষয়টি আর নিছক একটি দুর্ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ থাকে না। প্রশ্ন ওঠে পুরো ব্যবস্থাপনা কাঠামো নিয়ে। কারণ উদ্ধারকারী ব্যবস্থাই যদি ঝুঁকির বাইরে না থাকে, তাহলে দুর্ঘটনার পর দ্রুত ও নিরাপদ উদ্ধার কার্যক্রম কতটা নিশ্চিত?

 বাংলাদেশ রেলওয়েতে সাম্প্রতিক একের পর এক লাইনচ্যুতির ঘটনায় এমন প্রশ্নই ক্রমশ সামনে আসছে।

 সর্বশেষ ২ অক্টোবর ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়া রেলওয়ে স্টেশনের ইয়ার্ডের কাছে সিলেটের উদ্দেশে যাত্রার সময় একটি উদ্ধারকারী ট্রেনের ট্রলির চারটি চাকা লাইনচ্যুত হয়। এতে ঢাকা–চট্টগ্রাম রেলপথের ডাউন লাইনে ট্রেন চলাচল বন্ধ হয়ে যায় এবং রেলওয়ের এক কর্মী আহত হন। প্রায় দুই ঘণ্টা পর লাইনচ্যুত ট্রলিটি উদ্ধার করে যোগাযোগ স্বাভাবিক করা হয়। ঘটনাটি তদন্তে ঢাকা রেলওয়ে বিভাগ তিন সদস্যের কমিটি গঠন করেছে।

 ঘটনার সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিক হলো—যে ট্রেনের কাজ অন্য ট্রেনের দুর্ঘটনা মোকাবিলা করা, সেই উদ্ধারকারী ট্রেনই দুর্ঘটনার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এখানেই রেলওয়ের ব্যবস্থাপনার সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি দাঁড়ায়।

 উদ্ধারকারী ট্রেনেরই যদি নিরাপত্তা নিশ্চিত না থাকেঃ একটি রেলওয়ের নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা শুধু যাত্রীবাহী ট্রেন নিরাপদে চালানোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। ট্র্যাক, পয়েন্ট, সিগন্যাল, ইয়ার্ড, রোলিং স্টক, লোকোমোটিভ, ওয়াগন, উদ্ধারকারী সরঞ্জাম—সবকিছুই একই নিরাপত্তা ব্যবস্থার অংশ।

 বিশেষ করে উদ্ধারকারী ট্রেনের ক্ষেত্রে নিয়মিত কারিগরি পরীক্ষা আরও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ দুর্ঘটনা ঘটলে সময়ের বিরুদ্ধে লড়াই করেই সেটিকে ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে হয়।

 সেই উদ্ধারকারী ট্রেনের ট্রলির চারটি চাকা একসঙ্গে লাইনচ্যুত হওয়ার ঘটনা তাই স্বাভাবিকভাবেই জানতে চায়— ট্রলিটির সর্বশেষ কারিগরি পরীক্ষা কবে হয়েছিল? চাকা ও হুইল-সেটের অবস্থা কী ছিল? যাত্রার আগে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা পরীক্ষা সম্পন্ন হয়েছিল কি না?

ইয়ার্ডের সংশ্লিষ্ট লাইন ও পয়েন্ট ব্যবস্থার সর্বশেষ পরিদর্শন কবে হয়েছিল?

 এগুলো তদন্তের বিষয়। তদন্ত শেষ হওয়ার আগে কোনো একটি কারণকে দায়ী করা সমীচীন নয়। কিন্তু প্রশ্নগুলো এড়িয়ে যাওয়ারও সুযোগ নেই।

 একই এলাকায় পরপর ঘটনা কেন? আখাউড়ার ঘটনাটি আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে, কারণ এর মাত্র কয়েক দিন আগে ৩০ সেপ্টেম্বর রাতে আখাউড়ায় একটি তেলবাহী ওয়াগন ট্রেনের চাকা লাইনচ্যুত হয়েছিল। ওই ঘটনার পর দুর্ঘটনাকবলিত ট্রেন উদ্ধারে রেলওয়ের উদ্ধারকারী দল কাজ শুরু করে। তারপর ২ অক্টোবর সেই উদ্ধারকারী ট্রেনেরই ট্রলি লাইনচ্যুত হলো।

 দুটি ঘটনার কারণ একই—এমন কোনো সিদ্ধান্ত দেওয়ার সুযোগ নেই। তবে একই জংশন ও ইয়ার্ড এলাকায় অল্প সময়ের ব্যবধানে একাধিক লাইনচ্যুতির ঘটনা ঘটলে সংশ্লিষ্ট অবকাঠামো ও অপারেশনাল ব্যবস্থাপনা নিয়ে সামগ্রিক পর্যালোচনার প্রয়োজনীয়তা অবশ্যই তৈরি হয়।

 দুর্ঘটনা বাড়ছে, নাকি বাড়ছে ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা? সাম্প্রতিক সময়েও দেশের বিভিন্ন রেলপথে লাইনচ্যুতির ঘটনা ঘটেছে। সেপ্টেম্বরে গফরগাঁওয়ে একটি মালবাহী ট্রেনের বগি লাইনচ্যুত হয়ে ঢাকা–ময়মনসিংহ রুটে ট্রেন চলাচল বন্ধ হয়েছিল; সেখানে রিলিফ ট্রেন দিয়ে উদ্ধারকাজ করার কথা জানানো হয়েছিল।

 একটি দুর্ঘটনার পর আরেকটি দুর্ঘটনা ঘটতেই পারে। যান্ত্রিক ত্রুটি, অবকাঠামোগত সমস্যা, মানবিক ভুল, অতিরিক্ত গতি, পয়েন্ট বা ট্র্যাকের ত্রুটি কিংবা অন্য কোনো কারণ—তদন্ত ছাড়া কোনটি দায়ী তা বলা যায় না। কিন্তু বারবার দুর্ঘটনা ঘটলে শুধু দুর্ঘটনার কারণ খোঁজা যথেষ্ট নয়; দুর্ঘটনা প্রতিরোধের ব্যবস্থাপনাটিও পরীক্ষা করা প্রয়োজন।

 তদন্ত কমিটি নয়, চাই তদন্তের ফলাফলঃ রেলওয়েতে দুর্ঘটনার পর তদন্ত কমিটি গঠন নতুন কিছু নয়। আখাউড়ার সর্বশেষ ঘটনাতেও তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি করা হয়েছে।

কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে—তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশের পর সুপারিশগুলো কতটা বাস্তবায়ন হয়?

 একটি দুর্ঘটনার তদন্ত যদি শুধু তাৎক্ষণিক কারণ চিহ্নিত করে শেষ হয়ে যায়, কিন্তু একই ধরনের ঝুঁকি থেকে যায়, তাহলে সেই তদন্তের মূল উদ্দেশ্য পূরণ হয় না।

 প্রতিটি লাইনচ্যুতির পর তাই শুধু ‘কে ভুল করেছে’—এই প্রশ্ন নয়; বরং জানতে হবে—

ঝুঁকিটি আগে শনাক্ত হয়েছিল কি না; নিয়মিত পরিদর্শন হয়েছিল কি না; পূর্ববর্তী কোনো ত্রুটি বা সতর্কবার্তা ছিল কি না; রক্ষণাবেক্ষণ যথাসময়ে করা হয়েছিল কি না; দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জবাবদিহি কী; পূর্ববর্তী তদন্তের সুপারিশ বাস্তবায়িত হয়েছিল কি না।

 রেলওয়ের প্রয়োজন প্রতিক্রিয়াশীল নয়, প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থাপনা

দুর্ঘটনার পর উদ্ধারকারী ট্রেন পাঠানো জরুরি। কিন্তু একটি কার্যকর রেলওয়ে ব্যবস্থাপনার সাফল্য মাপা উচিত শুধু দুর্ঘটনার পর কত দ্রুত উদ্ধার করা হলো তা দিয়ে নয়—দুর্ঘটনা ঘটার আগেই কতটা ঝুঁকি শনাক্ত ও প্রতিরোধ করা গেল, সেটি দিয়েও।

 কারণ রেলপথে একটি লাইনচ্যুতি শুধু একটি ট্রেনের সমস্যা নয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয় শত শত যাত্রীর সময়, নিরাপত্তা, আর্থিক ক্ষতি এবং পুরো রেল নেটওয়ার্কের পরিচালনাগত চাপ।

আর উদ্ধারকারী ট্রেনই যদি লাইনচ্যুত হয়, তাহলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে পড়ে।

প্রশ্নটি তাই ব্যবস্থাপনাকে ঘিরেইঃ রেলওয়ের অবকাঠামো যত আধুনিকই হোক, ব্যবস্থাপনা দুর্বল হলে নিরাপত্তা ব্যবস্থা টেকসই হয় না। নতুন প্রকল্প, নতুন কোচ, নতুন লোকোমোটিভ কিংবা আধুনিক প্রযুক্তির পাশাপাশি প্রয়োজন দক্ষ রক্ষণাবেক্ষণ, নিয়মিত কারিগরি পরীক্ষা, কার্যকর নজরদারি, দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং সর্বোপরি জবাবদিহি।

 আখাউড়ার ঘটনা তাই শুধু একটি উদ্ধারকারী ট্রেনের চার চাকা লাইনচ্যুত হওয়ার ঘটনা নয়। এটি রেলওয়ের নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনার সক্ষমতা যাচাইয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপলক্ষ। কারণ যে ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব লাইনচ্যুত ট্রেনকে নিরাপদে উদ্ধার করা, সেই ব্যবস্থাপনাই যদি নিজের উদ্ধারযানকে নিরাপদ রাখতে ব্যর্থ হয়, তাহলে প্রশ্ন উঠবেই—

রেলওয়ের সমস্যা কি শুধু লাইনে, নাকি ব্যবস্থাপনার ভেতরেও কোথাও লাইনচ্যুতি ঘটেছে?


দৈনিক রেলওয়ে বার্তা

সম্পাদক ও প্রকাশকঃ মো: মনিরুজ্জামান (মনির) 

কপিরাইট © ২০২৬ দৈনিক রেলওয়ে বার্তা । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত