ঢাকা   সোমবার, ০২ নভেম্বর ২০২৬
দৈনিক রেলওয়ে বার্তা

মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচন : জয়-পরাজয়ের হিসাব-নিকাশ কার পক্ষে?



মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচন : জয়-পরাজয়ের হিসাব-নিকাশ কার পক্ষে?

ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রেসিডেন্টের মেয়াদের বাকি সময়টা কেমন কাটবে, তা নির্ধারণ করতে মঙ্গলবার ভোটকেন্দ্রে যাচ্ছেন আমেরিকার সাধারণ ভোটাররা। যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন স্তরের সরকার পরিচালনায় এবার অনেক আসনে প্রতিনিধি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। তবে ভোটার ও বিশ্লেষকদের মূল নজর কংগ্রেসের দুই কক্ষ—প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেটের সদস্য নির্বাচনের দিকে রয়েছে।

বর্তমানে কংগ্রেসের উভয় কক্ষেই সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের দল রিপাবলিকানদের। ফলে ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের শেষ দুই বছরের প্রশাসনিক সাফল্য কিংবা সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের সক্ষমতা পুরোপুরি ঝুলে আছে এ নির্বাচনের ফলাফলের ওপর।

প্রেসিডেন্টের জনপ্রিয়তার রেটিং, মূল নির্বাচনী লড়াইয়ের চিত্র, ভোটারদের কাছে প্রাধান্য পাওয়া ইস্যু এবং রেকর্ড পরিমাণ অর্থ খরচের হিসাব; সব মিলিয়ে ক্ষমতার এ লড়াই কোথায় নির্ধারিত হতে পারে, তা দেখে নেওয়া যাক...

• অসময়ে মধ্যবর্তী নির্বাচনের মুখে ট্রাম্প

বিরোধী দল ডেমোক্র্যাটদের কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ পুনরুদ্ধারের আশা জাগানোর অন্যতম প্রধান কারণ প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের নিম্নমুখী জনপ্রিয়তা। ঐতিহাসিক নিয়ম অনুযায়ী, প্রেসিডেন্টের এই জনপ্রিয়তার রেটিং থেকেই ধারণা পাওয়া যায় নির্বাচনে তার দল কতটা ভালো কিংবা খারাপ করতে পারে।

নির্বাচনী জরিপভিত্তিক ওয়েবসাইট সিলভার বুলেটিনের তথ্য অনুযায়ী, দ্বিতীয় মেয়াদের শুরুতে ট্রাম্পের জনপ্রিয়তার রেটিং ছিল ৫০ শতাংশের কিছুটা বেশি। কিন্তু তা দ্রুত কমে ৪০ শতাংশের ঘরে নেমে আসে।

চলতি বছরের ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে ট্রাম্প যখন ইসরায়েলকে সঙ্গে নিয়ে ইরানে বিমান হামলার সিদ্ধান্ত নেন, তখন তার জনপ্রিয়তার রেটিং ছিল ৪২ শতাংশের ঘরে। তবে হামলার পরপরই তা ৪০ শতাংশের নিচে নেমে যায় এবং বর্তমানে তা নেমে এসেছে প্রায় ৩৭ শতাংশে।

আট বছর আগে, প্রথম মেয়াদের ঠিক এই সময়ে ট্রাম্পের গ্রহণযোগ্যতার রেটিং ছিল ৪৩ শতাংশ। অন্যদিকে জো বাইডেনের মেয়াদের একই সময়ে তা ছিল ৪০ শতাংশ। অবশ্য দুই ক্ষেত্রেই তৎকালীন প্রেসিডেন্টরা মধ্যবর্তী নির্বাচনে প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ হারালেও সিনেটের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে পেরেছিলেন।

ট্রাম্পের এই নিম্নমুখী রেটিংই ডেমোক্র্যাটদের দুই কক্ষ জয়ের স্বপ্ন দেখাচ্ছে এবং যে কারণে তারা এমন সব অঙ্গরাজ্যে চোখ রাখছে, যেগুলো বিগত বছরগুলোতে রিপাবলিকানদের দুর্ভেদ্য দুর্গ হিসেবে পরিচিত ছিল।

• প্রতিনিধি পরিষদ দখলের হাড্ডাহাড্ডি লড়াই
নিম্নকক্ষ প্রতিনিধি পরিষদে রিপাবলিকানদের বর্তমান সংখ্যাগরিষ্ঠতা অত্যন্ত সূক্ষ্ম। ৪৩৫টি আসনের মধ্যে তাদের হাতে রয়েছে ২১৮টি আসন; যা নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য প্রয়োজনীয় ন্যূনতম সংখ্যা। এর বাইরে একজন স্বতন্ত্র সদস্য রয়েছেন, যিনি নিয়মিত রিপাবলিকানদের পক্ষেই ভোট দিয়ে থাকেন।

প্রতিনিধি পরিষদের সদস্যদের মেয়াদ দুই বছর। ফলে এবার সবকটি (৪৩৫টি) আসনেই নতুন করে নির্বাচন হচ্ছে। তবে অধিকাংশ আসনেই তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতার সম্ভাবনা নেই। কারণ সেসব আসনে যেকোনো নির্দিষ্ট দলের ভিত্তি এতটাই শক্ত যে বিজয়ী কে হবেন, তা প্রায় নিশ্চিত।

নির্বাচনী প্রচার ও ভোটের হিসাব-নিকাশ পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা দ্য কুক পলিটিক্যাল রিপোর্টের বিশ্লেষণ বলছে, মাত্র ১৮টি আসনে মূল দ্বিমুখী প্রতিযোগিতা বা টস-আপ হতে পারে; যার ফল যে কোনো দিকে যেতে পারে।

এই ১৮টি তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ আসনের মধ্যে ১৪টি বর্তমানে রিপাবলিকান এবং ৪টি ডেমোক্র্যাটদের দখলে। তবে ডেমোক্র্যাটরা এই ১৮টি আসনের একটিতেও জয় না পায়, তাহলেও তারা প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ পেয়ে যাবে; যদি কেবল নিজেদের অনুকূলে থাকা বা কিছুটা এগিয়ে থাকা ৩৬টি আসন তারা ধরে রাখতে পারে।

ইতিহাস বলছে, মধ্যবর্তী নির্বাচনে প্রেসিডেন্টের নীতির প্রতি ক্ষোভ প্রকাশ করতে গিয়ে প্রতিনিধি পরিষদে প্রচুর আসন হাতবদল হয়। ১৯৩৪ সালের পর থেকে পাওয়া তথ্যে দেখা যায়, মধ্যবর্তী নির্বাচনে প্রেসিডেন্টের দল গড়ে ২৭টি আসন হারায়। গত ২৩টি মধ্যবর্তী নির্বাচনের মধ্যে মাত্র ৩টিতে ক্ষমতাসীন দল আসন বাড়াতে পেরেছে।

• সিনেটের ভাগ্য নির্ধারণ যেভাবে
উচ্চকক্ষ সিনেটে রিপাবলিকানদের অবস্থান কিছুটা শক্ত। ১০০ সদস্যের সিনেটে রিপাবলিকানদের রয়েছে ৫৩টি আসন, আর ডেমোক্র্যাটদের ৪৫টি। বাকি দুটি আসনে স্বাধীন সদস্যরা থাকলেও তারা ডেমোক্র্যাটদের ভোট দেন।

সিনেটররা ছয় বছরের মেয়াদে নির্বাচিত হন। ফলে প্রতি দুই বছর পর পর সিনেটের এক-তৃতীয়াংশ আসনে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। আগামীকালকের এই নির্বাচনে ৩৫টি সিনেট আসনে ভোট হচ্ছে। কুক পলিটিক্যাল রিপোর্টের তথ্য বলছে, এর মধ্যে মাত্র ৭টি আসনে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের আভাস পাওয়া যাচ্ছে।

এই ৭টি সমমুখী আসনের ৬টি বর্তমানে রিপাবলিকানদের এবং ১টি ডেমোক্র্যাটদের দখলে। সিনেটের নিয়ন্ত্রণ ও ৫১টির সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে হলে ডেমোক্র্যাটদের এই সমমুখী আসনগুলোর অন্তত ৪টিতে জয়ের পাশাপাশি নিজেদের অনুকূলে থাকা আরও ৪টি আসন নিশ্চিত করতে হবে।

তবে ডেমোক্র্যাটদের জন্য সিনেটে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়া সহজ হবে না।

তাদের মিশিগানের আসনটি যেকোনো মূল্যে ধরে রাখতে হবে, যেখানে ডেমোক্রেটিক প্রার্থী বামপন্থী আবদুল এল-সায়েদ এবং রিপাবলিকান প্রার্থী সাবেক এফবিআই এজেন্ট ও ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ মিত্র মাইক রজার্সের মধ্যে তুমুল লড়াইয়ের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।

একই সঙ্গে ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ট্রাম্প যে অঙ্গরাজ্যগুলোতে বিশাল ব্যবধানে জয় পেয়েছিলেন; যেমন আলাস্কা, আইওয়া ও ওহাইও; সেখানেও ডেমোক্র্যাটদের আসন ছিনিয়ে আনতে হবে।

তবে বিভিন্ন জরিপ বলছে, ডেমোক্র্যাটদের সামনে জয়ের পথ একদম রুদ্ধ নয়। এমনকি টেক্সাসেও সাবেক শিক্ষক জেমস তালারিকো যদি ট্রাম্পের বিশ্বস্ত মিত্র ও রাজ্যের বর্তমান অ্যাটর্নি জেনারেল কেন প্যাক্সটনকে পরাজিত করতে পারেন, তাহলে ১৯৮৮ সালের পর তিনিই হবেন রাজ্যটিতে জয়ী প্রথম ডেমোক্র্যাট দলীয় সিনেটর।

• ভোটারদের নজর যেসব ইস্যুতে
২০২৪ সালের নির্বাচনী প্রচারে মূল্যস্ফীতি কমিয়ে আমেরিকা থেকে জীবনযাত্রার সংকট দূর করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন ট্রাম্প। কিন্তু বর্তমানে মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয়ই ভোটারদের জন্য প্রধান দুশ্চিন্তার বিষয় হয়ে উঠেছে।

গত ২৪ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট অব দ্য ইউনিয়ন ভাষণে ট্রাম্প সগর্বে দাবি করেছিলেন, অধিকাংশ অঙ্গরাজ্যে জ্বালানি তেলের দাম প্রতি গ্যালন ২.৩০ ডলারের নিচে। কিন্তু এর চার দিনের মাথায় ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ শুরু হলে মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হয় এবং যুক্তরাষ্ট্রে তেলের দাম লাফিয়ে গ্যালন প্রতি ৪ ডলারে গিয়ে ঠেকে।

আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এই যুদ্ধের প্রভাব এবং আমেরিকানদের দৈনন্দিন খরচে বাড়তি চাপ তৈরি হওয়ায় ইরান যুদ্ধ দিনে দিনে চরম অজনপ্রিয় হয়ে ওঠে। আগস্টের এক জরিপে দেখা যায়, ৬৩ শতাংশ আমেরিকানই ইরান পরিস্থিতি ট্রাম্প যেভাবে সামলিয়েছেন তা নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন।

জীবনযাত্রার ব্যয় ছাড়া ভোটারদের কাছে অন্য দুটি বড় বিষয় হলো স্বাস্থ্যসেবা এবং অভিবাসন। ট্রাম্প সম্প্রতি সীমান্ত দিয়ে অবৈধ অনুপ্রবেশ উল্লেখযোগ্য হারে কমানোর পরিসংখ্যান তুলে ধরে তার অভিবাসন নীতিকে বড় সাফল্য হিসেবে প্রচার করছেন।

অন্যদিকে, ডেমোক্র্যাট প্রার্থীরা যুক্তরাষ্ট্রের আকাশচুম্বী স্বাস্থ্যবিমা খরচ এবং ট্রাম্পের নতুন আইন কীভাবে চিকিৎসাসেবা পাওয়ার সুযোগকে সংকুচিত করেছে, তা ভোটারদের সামনে তুলে ধরছেন।

• বিজ্ঞাপনের জোয়ার ও ভবিষ্যতের রাজনীতি
নির্বাচনী সব সমীকরণই ডেমোক্র্যাটদের সুবিধাজনক অবস্থানে রাখছে। তবে ট্রাম্প এবং তার দল যদি সমস্ত জরিপ উল্টে দিয়ে প্রত্যাশার চেয়ে বেশি আসন পেয়ে যায়, তাহলে তা মোটেও চমকপ্রদ কিছু হবে না।

রিপাবলিকানদের সবচেয়ে বড় বিষয় হলো তাদের বিপুল পরিমাণ নির্বাচনী তহবিল রয়েছে।

অক্টোবরের মাঝামাঝি পর্যন্ত রিপাবলিকান ন্যাশনাল কমিটি ও তাদের সহযোগী দলগুলোর হাতে নগদ অর্থের পরিমাণ ছিল প্রায় ৩২ কোটি ডলার। বিপরীতে ডেমোক্র্যাটদের কাছে ছিল ২৩ কোটি ডলারের মতো।

এর বাইরে ট্রাম্পের রাজনৈতিক দল রিপাবলিকান পার্টির ‌‘মেইক আমেরিকা গ্রেট এগেইন’ আন্দোলনের প্রধান তহবিল সংগ্রহকারী শাখা ম্যাগা ইনকের কাছে গচ্ছিত রয়েছে আরও ১৬ কোটি ডলারেরও বেশি। এই বিপুল অর্থ রিপাবলিকানরা ব্যবহার করছে নির্বাচনী প্রচার ও বিজ্ঞাপনে।

গবেষণা সংস্থা অ্যাডইমপ্যাক্ট বলছে, কেবল সেপ্টেম্বর মাসেই যুক্তরাষ্ট্রে ১০০ কোটি ডলারেরও বেশি মূল্যের রাজনৈতিক বিজ্ঞাপন সম্প্রচার করা হয়েছে। রিপাবলিকানরা ডেমোক্র্যাটদের চেয়ে ২০ কোটি ডলার বেশি খরচ করেছে এবং সমমুখী লড়াইয়ের সিনেট আসনগুলোর প্রায় সব কটিতেই বিজ্ঞাপনে ডেমোক্র্যাটদের চেয়ে অনেক এগিয়ে রয়েছে।

শেষ মুহূর্তের এই বিজ্ঞাপনের জোয়ার রিপাবলিকান সমর্থকদের ভোটকেন্দ্রে টানবে এবং ভোটের লড়াইয়ে সম্ভাব্য ক্ষতি কমিয়ে আনবে বলে প্রত্যাশা করেছেন ট্রাম্প। ফলাফল যাই হোক না কেন, এই নির্বাচনের পরপরই সবার নজর চলে যাবে ২০২৮ সালের পরবর্তী মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের দিকে।

পুরো মধ্যবর্তী নির্বাচনে ট্রাম্পের অজনপ্রিয়তা একটি বড় বিষয় হলেও তার জন্য তৃতীয় মেয়াদে প্রেসিডেন্ট হওয়ার সাংবিধানিক সুযোগ নেই। ফলে ভোটার ও রাজনৈতিক মহলের মনোযোগ এখন ডেমোক্র্যাটদের নিজেদের ভিশন ও নীতি কী, তার ওপর গিয়ে পড়বে; কেবল ট্রাম্পের বিরোধিতার ওপর নয়।

আপনার মতামত লিখুন

দৈনিক রেলওয়ে বার্তা

সোমবার, ০২ নভেম্বর ২০২৬


মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচন : জয়-পরাজয়ের হিসাব-নিকাশ কার পক্ষে?

প্রকাশের তারিখ : ০২ নভেম্বর ২০২৬

featured Image

ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রেসিডেন্টের মেয়াদের বাকি সময়টা কেমন কাটবে, তা নির্ধারণ করতে মঙ্গলবার ভোটকেন্দ্রে যাচ্ছেন আমেরিকার সাধারণ ভোটাররা। যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন স্তরের সরকার পরিচালনায় এবার অনেক আসনে প্রতিনিধি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। তবে ভোটার ও বিশ্লেষকদের মূল নজর কংগ্রেসের দুই কক্ষ—প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেটের সদস্য নির্বাচনের দিকে রয়েছে।

বর্তমানে কংগ্রেসের উভয় কক্ষেই সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের দল রিপাবলিকানদের। ফলে ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের শেষ দুই বছরের প্রশাসনিক সাফল্য কিংবা সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের সক্ষমতা পুরোপুরি ঝুলে আছে এ নির্বাচনের ফলাফলের ওপর।

প্রেসিডেন্টের জনপ্রিয়তার রেটিং, মূল নির্বাচনী লড়াইয়ের চিত্র, ভোটারদের কাছে প্রাধান্য পাওয়া ইস্যু এবং রেকর্ড পরিমাণ অর্থ খরচের হিসাব; সব মিলিয়ে ক্ষমতার এ লড়াই কোথায় নির্ধারিত হতে পারে, তা দেখে নেওয়া যাক...

• অসময়ে মধ্যবর্তী নির্বাচনের মুখে ট্রাম্প

বিরোধী দল ডেমোক্র্যাটদের কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ পুনরুদ্ধারের আশা জাগানোর অন্যতম প্রধান কারণ প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের নিম্নমুখী জনপ্রিয়তা। ঐতিহাসিক নিয়ম অনুযায়ী, প্রেসিডেন্টের এই জনপ্রিয়তার রেটিং থেকেই ধারণা পাওয়া যায় নির্বাচনে তার দল কতটা ভালো কিংবা খারাপ করতে পারে।

নির্বাচনী জরিপভিত্তিক ওয়েবসাইট সিলভার বুলেটিনের তথ্য অনুযায়ী, দ্বিতীয় মেয়াদের শুরুতে ট্রাম্পের জনপ্রিয়তার রেটিং ছিল ৫০ শতাংশের কিছুটা বেশি। কিন্তু তা দ্রুত কমে ৪০ শতাংশের ঘরে নেমে আসে।

চলতি বছরের ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে ট্রাম্প যখন ইসরায়েলকে সঙ্গে নিয়ে ইরানে বিমান হামলার সিদ্ধান্ত নেন, তখন তার জনপ্রিয়তার রেটিং ছিল ৪২ শতাংশের ঘরে। তবে হামলার পরপরই তা ৪০ শতাংশের নিচে নেমে যায় এবং বর্তমানে তা নেমে এসেছে প্রায় ৩৭ শতাংশে।

আট বছর আগে, প্রথম মেয়াদের ঠিক এই সময়ে ট্রাম্পের গ্রহণযোগ্যতার রেটিং ছিল ৪৩ শতাংশ। অন্যদিকে জো বাইডেনের মেয়াদের একই সময়ে তা ছিল ৪০ শতাংশ। অবশ্য দুই ক্ষেত্রেই তৎকালীন প্রেসিডেন্টরা মধ্যবর্তী নির্বাচনে প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ হারালেও সিনেটের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে পেরেছিলেন।

ট্রাম্পের এই নিম্নমুখী রেটিংই ডেমোক্র্যাটদের দুই কক্ষ জয়ের স্বপ্ন দেখাচ্ছে এবং যে কারণে তারা এমন সব অঙ্গরাজ্যে চোখ রাখছে, যেগুলো বিগত বছরগুলোতে রিপাবলিকানদের দুর্ভেদ্য দুর্গ হিসেবে পরিচিত ছিল।

• প্রতিনিধি পরিষদ দখলের হাড্ডাহাড্ডি লড়াই
নিম্নকক্ষ প্রতিনিধি পরিষদে রিপাবলিকানদের বর্তমান সংখ্যাগরিষ্ঠতা অত্যন্ত সূক্ষ্ম। ৪৩৫টি আসনের মধ্যে তাদের হাতে রয়েছে ২১৮টি আসন; যা নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য প্রয়োজনীয় ন্যূনতম সংখ্যা। এর বাইরে একজন স্বতন্ত্র সদস্য রয়েছেন, যিনি নিয়মিত রিপাবলিকানদের পক্ষেই ভোট দিয়ে থাকেন।

প্রতিনিধি পরিষদের সদস্যদের মেয়াদ দুই বছর। ফলে এবার সবকটি (৪৩৫টি) আসনেই নতুন করে নির্বাচন হচ্ছে। তবে অধিকাংশ আসনেই তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতার সম্ভাবনা নেই। কারণ সেসব আসনে যেকোনো নির্দিষ্ট দলের ভিত্তি এতটাই শক্ত যে বিজয়ী কে হবেন, তা প্রায় নিশ্চিত।

নির্বাচনী প্রচার ও ভোটের হিসাব-নিকাশ পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা দ্য কুক পলিটিক্যাল রিপোর্টের বিশ্লেষণ বলছে, মাত্র ১৮টি আসনে মূল দ্বিমুখী প্রতিযোগিতা বা টস-আপ হতে পারে; যার ফল যে কোনো দিকে যেতে পারে।

এই ১৮টি তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ আসনের মধ্যে ১৪টি বর্তমানে রিপাবলিকান এবং ৪টি ডেমোক্র্যাটদের দখলে। তবে ডেমোক্র্যাটরা এই ১৮টি আসনের একটিতেও জয় না পায়, তাহলেও তারা প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ পেয়ে যাবে; যদি কেবল নিজেদের অনুকূলে থাকা বা কিছুটা এগিয়ে থাকা ৩৬টি আসন তারা ধরে রাখতে পারে।

ইতিহাস বলছে, মধ্যবর্তী নির্বাচনে প্রেসিডেন্টের নীতির প্রতি ক্ষোভ প্রকাশ করতে গিয়ে প্রতিনিধি পরিষদে প্রচুর আসন হাতবদল হয়। ১৯৩৪ সালের পর থেকে পাওয়া তথ্যে দেখা যায়, মধ্যবর্তী নির্বাচনে প্রেসিডেন্টের দল গড়ে ২৭টি আসন হারায়। গত ২৩টি মধ্যবর্তী নির্বাচনের মধ্যে মাত্র ৩টিতে ক্ষমতাসীন দল আসন বাড়াতে পেরেছে।

• সিনেটের ভাগ্য নির্ধারণ যেভাবে
উচ্চকক্ষ সিনেটে রিপাবলিকানদের অবস্থান কিছুটা শক্ত। ১০০ সদস্যের সিনেটে রিপাবলিকানদের রয়েছে ৫৩টি আসন, আর ডেমোক্র্যাটদের ৪৫টি। বাকি দুটি আসনে স্বাধীন সদস্যরা থাকলেও তারা ডেমোক্র্যাটদের ভোট দেন।

সিনেটররা ছয় বছরের মেয়াদে নির্বাচিত হন। ফলে প্রতি দুই বছর পর পর সিনেটের এক-তৃতীয়াংশ আসনে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। আগামীকালকের এই নির্বাচনে ৩৫টি সিনেট আসনে ভোট হচ্ছে। কুক পলিটিক্যাল রিপোর্টের তথ্য বলছে, এর মধ্যে মাত্র ৭টি আসনে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের আভাস পাওয়া যাচ্ছে।

এই ৭টি সমমুখী আসনের ৬টি বর্তমানে রিপাবলিকানদের এবং ১টি ডেমোক্র্যাটদের দখলে। সিনেটের নিয়ন্ত্রণ ও ৫১টির সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে হলে ডেমোক্র্যাটদের এই সমমুখী আসনগুলোর অন্তত ৪টিতে জয়ের পাশাপাশি নিজেদের অনুকূলে থাকা আরও ৪টি আসন নিশ্চিত করতে হবে।

তবে ডেমোক্র্যাটদের জন্য সিনেটে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়া সহজ হবে না।

তাদের মিশিগানের আসনটি যেকোনো মূল্যে ধরে রাখতে হবে, যেখানে ডেমোক্রেটিক প্রার্থী বামপন্থী আবদুল এল-সায়েদ এবং রিপাবলিকান প্রার্থী সাবেক এফবিআই এজেন্ট ও ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ মিত্র মাইক রজার্সের মধ্যে তুমুল লড়াইয়ের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।

একই সঙ্গে ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ট্রাম্প যে অঙ্গরাজ্যগুলোতে বিশাল ব্যবধানে জয় পেয়েছিলেন; যেমন আলাস্কা, আইওয়া ও ওহাইও; সেখানেও ডেমোক্র্যাটদের আসন ছিনিয়ে আনতে হবে।

তবে বিভিন্ন জরিপ বলছে, ডেমোক্র্যাটদের সামনে জয়ের পথ একদম রুদ্ধ নয়। এমনকি টেক্সাসেও সাবেক শিক্ষক জেমস তালারিকো যদি ট্রাম্পের বিশ্বস্ত মিত্র ও রাজ্যের বর্তমান অ্যাটর্নি জেনারেল কেন প্যাক্সটনকে পরাজিত করতে পারেন, তাহলে ১৯৮৮ সালের পর তিনিই হবেন রাজ্যটিতে জয়ী প্রথম ডেমোক্র্যাট দলীয় সিনেটর।

• ভোটারদের নজর যেসব ইস্যুতে
২০২৪ সালের নির্বাচনী প্রচারে মূল্যস্ফীতি কমিয়ে আমেরিকা থেকে জীবনযাত্রার সংকট দূর করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন ট্রাম্প। কিন্তু বর্তমানে মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয়ই ভোটারদের জন্য প্রধান দুশ্চিন্তার বিষয় হয়ে উঠেছে।

গত ২৪ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট অব দ্য ইউনিয়ন ভাষণে ট্রাম্প সগর্বে দাবি করেছিলেন, অধিকাংশ অঙ্গরাজ্যে জ্বালানি তেলের দাম প্রতি গ্যালন ২.৩০ ডলারের নিচে। কিন্তু এর চার দিনের মাথায় ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ শুরু হলে মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হয় এবং যুক্তরাষ্ট্রে তেলের দাম লাফিয়ে গ্যালন প্রতি ৪ ডলারে গিয়ে ঠেকে।

আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এই যুদ্ধের প্রভাব এবং আমেরিকানদের দৈনন্দিন খরচে বাড়তি চাপ তৈরি হওয়ায় ইরান যুদ্ধ দিনে দিনে চরম অজনপ্রিয় হয়ে ওঠে। আগস্টের এক জরিপে দেখা যায়, ৬৩ শতাংশ আমেরিকানই ইরান পরিস্থিতি ট্রাম্প যেভাবে সামলিয়েছেন তা নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন।

জীবনযাত্রার ব্যয় ছাড়া ভোটারদের কাছে অন্য দুটি বড় বিষয় হলো স্বাস্থ্যসেবা এবং অভিবাসন। ট্রাম্প সম্প্রতি সীমান্ত দিয়ে অবৈধ অনুপ্রবেশ উল্লেখযোগ্য হারে কমানোর পরিসংখ্যান তুলে ধরে তার অভিবাসন নীতিকে বড় সাফল্য হিসেবে প্রচার করছেন।

অন্যদিকে, ডেমোক্র্যাট প্রার্থীরা যুক্তরাষ্ট্রের আকাশচুম্বী স্বাস্থ্যবিমা খরচ এবং ট্রাম্পের নতুন আইন কীভাবে চিকিৎসাসেবা পাওয়ার সুযোগকে সংকুচিত করেছে, তা ভোটারদের সামনে তুলে ধরছেন।

• বিজ্ঞাপনের জোয়ার ও ভবিষ্যতের রাজনীতি
নির্বাচনী সব সমীকরণই ডেমোক্র্যাটদের সুবিধাজনক অবস্থানে রাখছে। তবে ট্রাম্প এবং তার দল যদি সমস্ত জরিপ উল্টে দিয়ে প্রত্যাশার চেয়ে বেশি আসন পেয়ে যায়, তাহলে তা মোটেও চমকপ্রদ কিছু হবে না।

রিপাবলিকানদের সবচেয়ে বড় বিষয় হলো তাদের বিপুল পরিমাণ নির্বাচনী তহবিল রয়েছে।

অক্টোবরের মাঝামাঝি পর্যন্ত রিপাবলিকান ন্যাশনাল কমিটি ও তাদের সহযোগী দলগুলোর হাতে নগদ অর্থের পরিমাণ ছিল প্রায় ৩২ কোটি ডলার। বিপরীতে ডেমোক্র্যাটদের কাছে ছিল ২৩ কোটি ডলারের মতো।

এর বাইরে ট্রাম্পের রাজনৈতিক দল রিপাবলিকান পার্টির ‌‘মেইক আমেরিকা গ্রেট এগেইন’ আন্দোলনের প্রধান তহবিল সংগ্রহকারী শাখা ম্যাগা ইনকের কাছে গচ্ছিত রয়েছে আরও ১৬ কোটি ডলারেরও বেশি। এই বিপুল অর্থ রিপাবলিকানরা ব্যবহার করছে নির্বাচনী প্রচার ও বিজ্ঞাপনে।

গবেষণা সংস্থা অ্যাডইমপ্যাক্ট বলছে, কেবল সেপ্টেম্বর মাসেই যুক্তরাষ্ট্রে ১০০ কোটি ডলারেরও বেশি মূল্যের রাজনৈতিক বিজ্ঞাপন সম্প্রচার করা হয়েছে। রিপাবলিকানরা ডেমোক্র্যাটদের চেয়ে ২০ কোটি ডলার বেশি খরচ করেছে এবং সমমুখী লড়াইয়ের সিনেট আসনগুলোর প্রায় সব কটিতেই বিজ্ঞাপনে ডেমোক্র্যাটদের চেয়ে অনেক এগিয়ে রয়েছে।

শেষ মুহূর্তের এই বিজ্ঞাপনের জোয়ার রিপাবলিকান সমর্থকদের ভোটকেন্দ্রে টানবে এবং ভোটের লড়াইয়ে সম্ভাব্য ক্ষতি কমিয়ে আনবে বলে প্রত্যাশা করেছেন ট্রাম্প। ফলাফল যাই হোক না কেন, এই নির্বাচনের পরপরই সবার নজর চলে যাবে ২০২৮ সালের পরবর্তী মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের দিকে।

পুরো মধ্যবর্তী নির্বাচনে ট্রাম্পের অজনপ্রিয়তা একটি বড় বিষয় হলেও তার জন্য তৃতীয় মেয়াদে প্রেসিডেন্ট হওয়ার সাংবিধানিক সুযোগ নেই। ফলে ভোটার ও রাজনৈতিক মহলের মনোযোগ এখন ডেমোক্র্যাটদের নিজেদের ভিশন ও নীতি কী, তার ওপর গিয়ে পড়বে; কেবল ট্রাম্পের বিরোধিতার ওপর নয়।


দৈনিক রেলওয়ে বার্তা

সম্পাদক ও প্রকাশকঃ মো: মনিরুজ্জামান (মনির) 

কপিরাইট © ২০২৬ দৈনিক রেলওয়ে বার্তা । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত